রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবকের দায়িত্বে

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে শপথ নিয়ে বঙ্গভবন অধ্যায় সূচনা করলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বঙ্গভবনের দরবার হলে গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তাকে শপথ পাঠ করান ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার পরই মন্ত্রিসভায় নতুন চার পূর্ণমন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রীকে শপথ পাঠ করান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সাবেক অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, রাষ্ট্রের আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগের প্রতিনিধি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, রাজনৈতিক দলের নেতা, বিদেশি কূটনীতিক, সংসদ সদস্য, বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পেশার কয়েকশ অতিথি উপস্থিত ছিলেন।

শপথ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। জাতীয় সংগীতের পর পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর রাষ্ট্রপতিকে শপথবাক্য পাঠ করান ভারপ্রাপ্ত স্পিকার। শপথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের কর্তব্য বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালনের অঙ্গীকার করেন। বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণের পাশাপাশি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথও নেন। এ ছাড়া ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সবার প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহীত আচরণের অঙ্গীকার ছিল শপথবাক্যে।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিতে বঙ্গভবনে যাওয়ার আগে দুপুরে মির্জা ফখরুল ইসলাম বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন। বেইলি রোডের স্টাফ কোয়ার্টার জামে মসজিদে জুমার নামাজ পড়া শেষে পৌনে ২টার দিকে তিনি শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে যান। সেখানে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে সুরা ফাতেহা পাঠ এবং মোনাজাত করেন তিনি। এ সময় বিএনপির সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন ও নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব ইউনুস আলী উপস্থিত ছিলেন।

যেভাবে রাষ্ট্রপ্রধানের পদে : আওয়ামী লীগের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিন স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। পরে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর থেকেই কে হচ্ছেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। এর মধ্যে ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তারিখ ধার্য রেখে তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

নানা আলোচনার মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তৃণমূল থেকে উঠে এসে বিএনপির দুর্দিনের কাণ্ডারি ও সজ্জন হিসেবে পরিচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের প্রার্থী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। তিনি তখন বিএনপির মহাসচিব ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে দলীয় সিদ্ধান্ত ঘোষণার দিনে ১৩ আগস্ট সাংবিধানিক বিধান ও দলীয় সংশ্লিষ্টতা এড়াতে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মির্জা ফখরুল।

এরপর গত বৃহস্পতিবার দীর্ঘ ৩৫ বছর পর জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি পদে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে ভোটগ্রহণ। পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা এএমএম নাসির উদ্দিন ফল ঘোষণা করেন।

নির্বাচনে মোট ৩৪৯ ভোটারের মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দেন। অনুপস্থিত থাকায় ছয় সংসদ সদস্যের ভোট পড়েনি। নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট এবং অলি আহমদ ৮৮ ভোট পান। গণনা শেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ওই দিনই ইসি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ১১ ধারা অনুযায়ী গেজেট প্রকাশ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করেন। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে শপথ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালন শুরু করলেন তিনি।

ভারত পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের অভিনন্দন : বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানিয়েছে ভারত, পাকিস্তান, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ড। বৃহস্পতিবার ও গতকাল পৃথক বার্তায় এসব দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে।

নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কাজ করার জন্য তিনি উন্মুখ হয়ে আছেন। বিবৃতিটি গতকাল ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনার দায়িত্বভার গ্রহণ উপলক্ষে আমি আপনাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। আমি নিশ্চিত যে, আপনার দীর্ঘ জনজীবন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জনগণের সেবায় একটি সফল সময়ের সূচনা করবে।

ভারতের রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এক অনন্য সম্পর্ক বিদ্যমান, যার মূলে রয়েছে ত্যাগের অভিন্ন ইতিহাস, ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক বন্ধন এবং বন্ধুত্বের উষ্ণ সম্পর্ক। সম্প্রতি জ্বালানি, প্রযুক্তি, সংযোগ, যুববিষয়ক, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রমাগত আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক প্রসারিত হয়েছে। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করতে আমি আপনার সঙ্গে কাজ করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি।

মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন জানিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারে তাকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। গতকাল ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অভিনন্দনবার্তায় জারদারি আস্থা প্রকাশ করেন যে রাষ্ট্রপতি ফখরুলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে এবং জনগণের কল্যাণে আরও অগ্রগতি অর্জন করবে।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট বলেন, অভিন্ন ইতিহাস, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের ভিত্তিতে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তিনি দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সাম্প্রতিক ইতিবাচক গতিকে স্বাগত জানান এবং আশা প্রকাশ করেন, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বাড়বে। জারদারি আরও বলেন, পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও জোরদার এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে আরও বেশি যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় রয়েছেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রপতি ফখরুলকে সুবিধাজনক সময়ে পাকিস্তান সফরেরও আমন্ত্রণ জানান।

বাংলাদেশে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের দূতাবাস সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশিত এক শুভেচ্ছাবার্তায় বলেছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে উষ্ণ অভিনন্দন। চীন সবসময় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। নতুন যুগে দুই দেশের জন্য চীন একটি অংশীদারত্বমূলক ভবিষ্যৎ গঠনে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে, যাতে উভয় দেশ ও এর জনগণ অধিকতর সুফল ভোগ করতে পারে।

বাংলাদেশে যুক্তরাজ্য দূতাবাসও ফেসবুকে দেওয়া এক বার্তায় নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আন্তরিক অভিনন্দন। দুই দেশের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে আরও সুদৃঢ় করতে যুক্তরাজ্য রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা করছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়ে ফ্রান্স দূতাবাসের এক পোস্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ হিসেবে তার দীর্ঘদিনের অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে ফ্রান্স দূতাবাস। বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় ও গভীর করতে ফ্রান্স প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের পোস্টে মির্জা ফখরুলকে অভিনন্দন জানিয়ে বলা হয়, দীর্ঘদিনের অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারে কাজ করে যেতে তারা আগ্রহী।

রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের নতুন সচিব সালাহউদ্দিন নাগরী : রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ে জনবিভাগে নতুন সচিব নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান (সচিব) এজেএম সালাহউদ্দিন নাগরীকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগের সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া এ কর্মকর্তাকে ওই পদে নিযুক্ত করে গতকাল শুক্রবার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অপর আদেশে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জনবিভাগের সচিব রফিকুল আই মোহাম্মদকে চুক্তিতে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব হিসেবে বদলি করা হয়েছে।

এ ছাড়া পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব মোহা. শওকত রশীদ চৌধুরীকে ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান (সচিব) হিসেবে বদলি করা হয়েছে। তিনিও চুক্তিতে নিয়োজিত ছিলেন।