ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনের বাইরে থাকা কিছু অনুমোদনহীন স্থাপনা গত বুধবার রাতে সরিয়ে দেয় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, স্থাপনাগুলো হাইকমিশন চত্বরের নির্ধারিত সীমানার বাইরে ছিল। পাকিস্তানের নেওয়া একটি পদক্ষেপের পাল্টা হিসেবেই ভারত এ পদক্ষেপ নিয়েছে। এর তিন দিন আগে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ভারতীয় হাইকমিশনের বাইরে থাকা পার্কিংয়ের খুঁটি সরিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ। ভারতীয় হাইকমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানানোর পরও এসব খুঁটি সরানো হয়। এ ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েন আরও বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনের ভিসা বিভাগের কাছাকাছি এলাকায় এসব স্থাপনা তৈরি করা হয়েছিল। গত বুধবার রাতে কর্তৃপক্ষ সেখানে অভিযান চালিয়ে অনুমোদনহীন স্থাপনা সরিয়ে দেয়। ভারতীয় কর্মকর্তাদের বরাতে এনডিটিভির খবরে বলা হয় নয়াদিল্লিতে ভেঙে ফেলা স্থাপনাগুলো অনুমোদিত সীমানার বাইরে নির্মাণ করা হয়েছিল। ভিসা সেন্টারের কাছে মানুষের সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর জন্য বানানো অবকাঠামোও ভেঙে ফেলা হয়েছে। পাকিস্তান হাইকমিশনের বাইরে থাকা নিরাপত্তাবেষ্টনীর কিছু অংশও সরিয়ে দিয়েছে নয়াদিল্লি। কূটনৈতিক চত্বরটি ঘিরে রাখা ট্রাফিক বোলার্ড ও ব্যারিকেডও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলার পর সেখানে ধ্বংসাবশেষ পড়ে ছিল।
গতকাল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পাকিস্তানে অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনের কিছু স্থাপনা আমাদের অনুরোধ সত্ত্বেও সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এটি ঘটে যাওয়ার পর আমরা সমানুপাতিক পদক্ষেপ হিসেবে এখানে (দিল্লিতে) পাকিস্তানি হাইকমিশনের বাইরের গলির কিছু অস্থায়ী স্থাপনা সরিয়ে নিয়েছি।
দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে এমন পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ও পাকিস্তান পরস্পরের কূটনৈতিক মিশনের কর্মী সংখ্যা কমানো, প্রবেশাধিকার কঠোর করা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক বিধিনিষেধ আরোপের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েন আরও বেড়েছে।
গত বছরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও তলানিতে ঠেকে। জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে ওই হামলায় ২৬ জন নিহত হন। হামলার পর ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়ার অভিযোগ তোলে। এরপর মে মাসে পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী অবকাঠামো লক্ষ্য করে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালায় ভারত। এর জেরে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৮৭ ঘণ্টা ধরে সামরিক সংঘাত চলে।
এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিলেই ভারত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পাকিস্তান সীমান্ত পারের সন্ত্রাসবাদে সমর্থন বন্ধ না করা পর্যন্ত চুক্তিটি স্থগিত থাকবে বলে জানিয়েছিল নয়াদিল্লি।
এসব ঘটনার পর দুই দেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। ২০১৯ সালের আগস্টে পাকিস্তান ভারতে নিযুক্ত হাইকমিশনারের মর্যাদা কমিয়ে ‘চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স’ পর্যায়ে নামিয়ে আনে।
পেহেলগাম হামলার পর ভারত পাকিস্তান হাইকমিশন থেকে সামরিক, নৌ ও বিমানবাহিনীর উপদেষ্টাদেরও বহিষ্কার করে। একই সঙ্গে আটারি সীমান্তের সমন্বিত চেকপোস্ট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং পাকিস্তানি নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুবিধাও বাতিল করে ভারত। পরে নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনের কর্মী সংখ্যা ৫৫ থেকে কমিয়ে ৩০ জনে নামিয়ে আনা হয়।
এর জবাবে পাকিস্তান ভারতীয় মালিকানাধীন বিমান সংস্থাগুলোর জন্য নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে সীমান্তের পাকিস্তান অংশের চেকপোস্টও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পাকিস্তান হাইকমিশনের বাইরে স্থাপনা সরানো এবং ইসলামাবাদে ভারতীয় হাইকমিশনের বাইরে পার্কিংয়ের খুঁটি অপসারণ, দুই দেশের সম্পর্কের সেই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপেরই ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে ভারতের এই পদক্ষেপের দিনই জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক মন্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান।
ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতের একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ অংশ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে বুধবার রাতে ইসলামাবাদে নিযুক্ত মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে পাকিস্তান। এ সময় তার কাছে কঠোর প্রতিবাদ জানানো হয়।
জম্মু ও কাশ্মীর ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, এ বিষয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধান হওয়া উচিত। তবে গোরের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে সেই অবস্থানের তুলনায় ভারতের প্রতি অধিক সমর্থন হিসেবে দেখছে ইসলামাবাদ।
ভারতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হওয়ার পর চলতি বছর প্রথমবারের মতো জম্মু ও কাশ্মীর সফরে গিয়ে এই মন্তব্য করেন গোর।