অস্তিত্ব সংকটে বর্ণি বাঁওড়

একসময় যে বাঁওড়ের সুস্বাদু মাছের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল সুদূর কলকাতা পর্যন্ত, সেই ঐতিহাসিক বর্ণি বাঁওড় আজ হারাতে বসেছে তার চিরচেনা রূপ। কচুরিপানার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, পলি জমে তলদেশ ভরাট হওয়া, পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা এবং নির্বিচারে অবৈধ মৎস্য শিকারের ফলে চরম সংকটে পড়েছে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বর্ণি ও কুশলী ইউনিয়নজুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল প্রাকৃতিক জলাভূমি।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা বর্ণির বাঁওড় শুধু একটি জলাশয় নয়, এ অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, জীবিকা ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। একসময় এর পানিতে বিচরণ করত নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। ভোরের আলো ফুটতেই জেলেদের নৌকা আর জালে ধরা পড়া মাছ বেচাকেনার ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠত বাঁওড়ের চারপাশ। রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, শোল, টেংরা, পুঁটি, কৈসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ ছিল এই জলাভূমির অন্যতম মৎস্য সম্পদ। প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা এসব মাছের স্বাদ ও গুণগত মানের কারণে বর্ণির বাঁওড়ের আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মাছ ব্যবসায়ীরা এখানে আসতেন। স্থানীয় প্রবীণ মাছ ব্যবসায়ী ও জেলেদের স্মৃতিতে এখনো জীবন্ত সেই সময়ের কথা। বর্ণির বাঁওড় পাড়ে নকরীর চর গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী হানিফ মল্লিক বলেন, একসময় বর্ণির বাঁওড়ে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীরা মাছ কিনতে আসতেন। গোপালগঞ্জ শহরে মাছ বিক্রি করতে নিয়ে গেলে নিমেষেই তা বেশি দামে বিক্রি হয়ে যেত। একদল মানুষ এই বাঁওড়ের মাছের প্রতীক্ষায় থাকত প্রতিদিন। এই বাঁওড়ের মাছের সুনাম আশপাশের জেলা পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল সুদূর কলকাতা পর্যন্ত। কিন্তু নানা কারণে আগের সেই মাছ এখন আর নেই। তবে সরকার উদ্যোগ নিলে এই বাঁওড়ের মাছের সুদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন তিনি।

বর্ণির বাঁওড় শুধু মাছের আবাসস্থল ছিল তা নয়, এটি ছিল অসংখ্য জলজ প্রাণী ও পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বাঁওড়ের পানিতে মাছের বিচরণ, চারপাশে শাপলা-শালুক আর সবুজের সমারোহ, সব মিলে তৈরি হয়েছিল একটি সমৃদ্ধ জলজ বাস্তুতন্ত্র। আকাশে উড়ে বেড়াত বক, মাছরাঙা, পানকৌড়ি ও ডাহুকসহ নানা প্রজাতির পাখি। এই জলাভূমিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল বহু মানুষের জীবন-জীবিকা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্থানীয় জেলে পরিবারগুলো বাঁওড়ের মাছ ধরে সংসার চালিয়ে এসেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি অবৈধ চায়না জাল ও বৈদ্যুতিক শক ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছ শিকার করছে। এতে শুধু মাছ নয়, বাঁওড়ের অন্যান্য জলজ প্রাণী ও সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে কচুরিপানার বিস্তার এবং পলি জমে বাঁওড়ের বিভিন্ন অংশের পানির গভীরতা কমে যাওয়ায় জলজ পরিবেশও পরিবর্তিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি জলাভূমির গুরুত্ব শুধু সেখানে থাকা মাছের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাছ, জলজ উদ্ভিদ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা জলাভূমির বাস্তুতন্ত্র পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বর্ণির বাঁওড়ের মতো প্রাকৃতিক জলাভূমি সংরক্ষণ করা গেলে একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য রক্ষা হবে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকাও টেকসই হবে। এ জন্য প্রয়োজন বাঁওড়ের কচুরিপানা অপসারণ, পলি ব্যবস্থাপনা, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, দেশীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র ও অভয়াশ্রম সংরক্ষণ এবং অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে কার্যকর নজরদারি। পাশাপাশি স্থানীয় জেলে ও বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

গোপালগঞ্জের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, বর্ণির বাঁওড়ের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের অভয়াশ্রম নির্মাণ এবং অবৈধভাবে মাছ শিকারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে জনবল সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সব এলাকায় নিয়মিত নজরদারি করা কঠিন। এ অবস্থায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে মৎস্য বিভাগ।