উলিপুর পৌর বর্জ্য শোধনাগার প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখার আগেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। ৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দীর্ঘ ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। বর্তমানে খোলা আকাশের নিচে অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলায় তৈরি হয়েছে পরিবেশ বিপর্যয়। বর্জ্যরে বিষাক্ত তরল অংশ সংলগ্ন বিলের পানিতে মিশে উজাড় হচ্ছে দেশীয় মাছ, পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বিলের ধান চাষ। তীব্র দুর্গন্ধের পাশাপাশি এলাকায় মশা-মাছির উপদ্রব ও নানা জটিল রোগের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ফলে চার গ্রামের কয়েক হাজার বাসিন্দা এখন চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন।
জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, বাংলাদেশ ২৩টি পৌরসভার পানি সরবরাহ ও সেনিটেশন প্রকল্পের আওতায় ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)-এর অর্থায়নে ৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নাওডাঙ্গা বিলে বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণে ২০২১ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়। কাজের দায়িত্ব পান কুড়িগ্রামের ঠিকাদার এস এম আদিল এন্টারপ্রাইজ। কাজটি ২০২২ সালে শেষ হওয়ার কথা। প্রথমে নকশা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। নকশা সংশোধনের পর কিছুদিন কাজ চলে। কিন্তু সংশোধিত বিল নিয়ে জটিলতা দেখা দিলে সেই থেকে কাজ বন্ধ রেখেছেন ঠিকাদার। সংশোধিত নকশা মোতাবেক অর্থ বরাদ্দের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন না পাওয়ায় বিল প্রদান করা যাচ্ছে না বলে জানায় সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
সরেজমিনে নাওডাঙ্গা বিল এলাকায় গিয়ে দেখা যায় বর্জ্য শোধনাগার প্রকল্পের ভিত্তির পাশেই স্তূপ করে ফেলা হচ্ছে পৌরসভার দৈনিক বর্জ্য। বৃষ্টির পানির সঙ্গে সেই বর্জ্য বিলে ছড়িয়ে পড়ায় দুর্গন্ধে আশপাশের পরিবেশ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। নাওডাঙ্গা গ্রামের মো. আব্দুল গনি মেম্বার বলেন, শোধনাগার করার জন্য পৌরসভার কাছে জমি বিক্রি করে বিপাকে পড়েছি। আগে বিলে মাছ চাষ ও ধান চাষ করে লাখ টাকা আয় হতো এখন কিছুই করতে পাচ্ছি না। বর্জ্যরে তরল অংশ পানিতে পড়ে বিলের পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে। পানিতে নামা যায় না, পানি ব্যবহারও করা যায় না। ফলে জমি পড়ে থাকছে। গ্রামের মানুষ আমাদের দুষছে, গালিগালাজ করছে। জমির মালিক সাবেক কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, এখানে বর্জ্য শোধনাগার করতে দিয়ে যে ভুল করেছি তা বলা যায় না। বর্জ্যরে দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব ও রোগব্যাধি লেগেই আছে। শোধনাগার হবে এ জন্য জনস্বার্থে জমি দিয়েছি। কিন্তু প্রকল্পটি এভাবে ঝুলে থাকবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই এভাবে বর্জ্য ফেলে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাবে তা বুঝতে পারিনি। তিনি জানান, পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে পূর্ব নাওডাঙ্গা, পশ্চিম নাওডাঙ্গা, রাজারাম ক্ষেত্রী ও নিজাই খামার এই চার গ্রামের মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। আব্দুল গনি ও রফিকুলের মতো নজরুল মাস্টার, নুর হোসেন বলেন, ২০ একরের এ বিলে জমির মালিকরা সবাই মিলে সমবায় ভিত্তিতে মাছের চাষ ও আমন ধান চাষ করতাম, তা এখন করতে পাচ্ছি না। সবার একটাই দাবি দ্রুত শোধনাগার নির্মাণের।
উলিপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম বলেন, আমরা জমি কিনে দিয়েছি। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে জনস্বাস্থ্য বিভাগ। সংশোধিত নকশা মোতাবেক বিল প্রদান না করায় ঠিকাদার কাজ করছে না বলে জেনেছি। বর্জ্য শোধনাগারটি এক বছরে নির্মাণ হওয়ার কথা, সেখানে ছয় বছরেও শেষ না হওয়ায় বাধ্য হয়ে প্রকল্প এলাকায় বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এতে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে। এলাকার মানুষ জনদুর্ভোগের অভিযোগ করছে। ফলে আমরা বর্জ্য নিয়ে মারাত্মক বিপাকে পড়েছি। প্রকল্পটি শেষ করার জন্য কয়েক দফা তাগাদা দিয়ে চিঠিও দিয়েছি।
উলিপুর উপজেলা জনস্বাস্থ্য উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, প্রথম নকশাটি ছিল পতিত জমিতে। পরে জমি পরিবর্তন করে নিচু জমিতে (বর্তমান) প্রকল্পের ভিত্তি দেওয়া হয়। জমি পরিবর্তনের ফলে নকশাও পরিবর্তন করা হয়। নকশা সংশোধন হলেও সংশোধিত অর্থের অনুমোদন না হওয়ায় ঠিকাদারের বিল দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে কাজ বন্ধ করেছেন ঠিকাদার।
মেসার্স আদিল এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি আমিনুর রহমান বলেন, নকশা পরিবর্তন হলেও অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজ বন্ধ রয়েছে। অর্থ বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু করব। কুড়িগ্রাম জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হারুনুর রশিদ বলেন, জমি পরিবর্তনের কারণে নকশা পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় কাজ বন্ধ রয়েছে। আমরা বরাদ্দ চেয়ে অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক এ টি এম আরিফ বলেন, নকশা পরিবর্তন অনুমোদন পেয়েছে। কিন্তু পরিবর্তিত নকশার অর্থ বরাদ্দ আসেনি। বরাদ্দ পেলেই কাজটি সম্পন্ন হবে।