হ্যারির ঘরে ফেরা: ব্রিটেনের প্রয়োজন ছিল এমনই এক নাটকীয় মোড়

ব্রিটেনের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সোপ অপেরা হিসেবে অধিকাংশ মানুষ ‘দ্য আর্চার্স’-এর কথা মনে করেন। কিন্তু স্পষ্ট প্রার্থী হিসেবে রাজপরিবারের কথা তারা যেন ভুলেই যান। ১৬০৩ সালে স্কটল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জেমস ইংল্যান্ডের প্রথম জেমস হিসেবে সিংহাসনে বসার মধ্য দিয়ে যে ‘ইউনিয়ন অব দ্য ক্রাউনস’ শুরু হয়েছিল, সেটিকে সূচনাবিন্দু ধরলে রাজপরিবারের এই ধারাবাহিকতা চলছে ৪২৩ বছর ধরে। অবশ্য ১৬৪৯ থেকে ১৬৬০ সাল পর্যন্ত কিছুটা বিরতি ছিল। সে সময় অলিভার ক্রমওয়েল ভুল করে ভেবেছিলেন, প্রজাতন্ত্র হয়তো ব্রিটিশ জনগণের কাছে আরও আকর্ষণীয় হবে।

শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, মানুষ আসলে চায় রসিকতা ও পুনরুদ্ধার-যুগের নাটকের প্রতি অনুরাগী, অসংখ্য উপপত্নী থাকা এক ফুরফুরে ‘মেরি মনার্ক’-কেই।

‘দ্য ক্রাউন’-এর নির্মাতারা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বুঝেছিলেন, রাজসিংহাসনকে কেন্দ্র করে নাটক বানিয়ে খুব কম নাট্যকারই দেউলিয়া হয়েছেন। তবে সত্যি বলতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজপরিবারের গল্প কিছুটা নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিল। সবচেয়ে প্রাণবন্ত কয়েকজন চরিত্রও এই নাটক থেকে বিদায় নিয়েছেন। বিশেষ করে প্রিন্স ফিলিপের চলে যাওয়া আমি খুব অনুভব করি—তার অসাধারণ রসবোধ ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের অভাব ছিল অনন্য। আর একজনকে অত্যন্ত অস্বস্তিকর আচরণের কারণে কার্যত এই নাটকের বাইরে চলে যেতে হয়েছে।

কঠোর শোনাতে চাই না, তবে এডওয়ার্ড ও সোফিকে ঘিরে যে গল্পকে এতটা সামনে আনা হয়েছিল, তা আমাকে প্রায় কোমায় পাঠিয়ে দিচ্ছিল। তারা নিঃসন্দেহে ভালো ও ভদ্র মানুষ। কিন্তু চুল কাটাতে গিয়ে কেউ তাদের নিয়ে নাপিতের সঙ্গে গসিপ করবে—এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

তাই সাসেক্সের ডিউক ও ডাচেসের যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার খবরে আমি দারুণ খুশি। ব্রিটেনের প্রিয় এই জাতীয় নাটকে তাদের প্রত্যাবর্তন যেন চিরন্তন ‘ঘরের ছেলে ঘরে ফেরার’ গল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর নাটকীয়তা ২০০৩ সালে ‘ইস্টএন্ডার্স’-এ ‘ডার্টি ডেন’ ওয়াটসের ফিরে এসে শ্যারন মিচেলকে ‘হ্যালো, প্রিন্সেস’ বলার দৃশ্যের সঙ্গে অনায়াসে তুলনা করা যায়।

ছেলেদের মা হিসেবে প্রিন্স হ্যারির প্রতি আমার বরাবরই আলাদা দুর্বলতা রয়েছে। তিনি দ্বিতীয় সন্তানদের অনেকটা চেনা বৈশিষ্ট্য বহন করেন—আবেগপ্রবণ, মজার, সাহসী, ভালোবাসাপূর্ণ ও অনুগত। যাকে ভালোবাসেন, তার প্রতি বিশ্বস্ত। দীর্ঘ সময় বইয়ের টেবিলে বসে থাকার চেয়ে কর্মক্ষেত্রেই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ। বিশেষ করে ইনভিক্টাস গেমসের প্রতি তার অঙ্গীকার আমার প্রশংসার দাবি রাখে। সশস্ত্র সংঘাতে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া সাবেক সেনাসদস্যদের কাছে এই আয়োজন যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা স্পষ্ট।

সবসময় মনে রাখতে হবে, এই সেই মানুষ, যিনি মাত্র ১২ বছর বয়সে তার প্রিয় মাকে ভয়াবহ এক ঘটনায় হারিয়েছিলেন। এরপর তাকে মায়ের প্রকাশ্য অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় কফিনের পেছনে হেঁটে যেতে হয়েছিল। অথচ কেউ কেউ যেন মনে করেন, শোক ও শৈশবের মানসিক আঘাতের প্রভাবেরও একটা মেয়াদ থাকা উচিত।

এ বিষয়ে আমার নিজের একটি অভিজ্ঞতাও আছে। আমার স্বামী একজন পুরোনো ধাঁচের, টুইড পরা ভদ্রলোক। এ বছর তার বয়স ৭৩ হয়েছে। কিন্তু ১৩ বছর বয়সে মাকে হারানোর সেই ঘটনা আজও কোনো না কোনোভাবে তাকে প্রভাবিত করে। তিনি নিয়মিত স্বপ্ন দেখেন—তাকে বোর্ডিং স্কুল থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং একটি অচেনা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তার বাবা তাকে মায়ের ক্যানসারে মৃত্যুর খবর জানাচ্ছেন।

জাতীয় এই নাটকে মেগানের প্রত্যাবর্তনকেও আমি স্বাগত জানাই। তার সমালোচক কম নেই। তবে দৃঢ়চেতা ও স্পষ্টবাদী স্ত্রীদের এমন সমালোচনা প্রায় সব সময়ই থাকে। আর সব ভালো সোপ অপেরার কেন্দ্রেই থাকে এমন শক্তিশালী, আপসহীন নারী—‘ব্রুকসাইড’-এর বেথ জর্ডাশ থেকে ‘কোরোনেশন স্ট্রিট’-এর কার্লা কনর পর্যন্ত।

আমি ওয়েলসের রাজকুমারী ক্যাথরিনেরও বড় ভক্ত। তবে ভবিষ্যৎ রানি হিসেবে তার ভূমিকায় তাকে অবশ্যই নিখুঁত শিষ্টাচার বজায় রাখতে হয়। তাই তার ভেতরে কী নিয়ে ক্ষোভ জমে বা কোন বিষয় তাকে আবেগতাড়িত করে—তা কেবল অনুমানই করা যায়।

সাসেক্স দম্পতি যেহেতু আনুষ্ঠানিক উইন্ডসর রাজদরবারের বাইরে রয়েছেন, তাই তাদের নিজেদের মতো বাস্তব ও খোলামেলা মানুষ হিসেবে থাকার স্বাধীনতা রয়েছে। তারা আপনাকে বা আমাকে খুশি করার জন্য মঞ্চে আসছেন না। আর এই কারণেই জাতীয় মঞ্চে তারা তাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের চেয়ে সবসময়ই বেশি আকর্ষণীয় চরিত্র হয়ে থাকবেন।

তবে একবিংশ শতাব্দীর এই ‘ঘরে ফেরার’ গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো—এটি আমাদের নিজেদের পারিবারিক নাটকগুলোর জন্যও আশা জাগায়। এমন পরিবার খুব কমই আছে, যেখানে কখনো মনোমালিন্য হয়নি কিংবা বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের বিরোধ তৈরি হয়নি।

আমার নিজের পরিবারেও এমন ঘটনা ঘটেছে। আমার অসীম দয়ালু ও ধৈর্যশীল মা একবার আমার ২০ বছর বয়সের আত্মকেন্দ্রিক আচরণে এতটাই বিরক্ত হয়েছিলেন—সে সময় আমার বাবা গুরুতর অসুস্থ ছিলেন—যে তিনি তিন সপ্তাহ আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ রেখেছিলেন।

এখন পেছনে ফিরে তাকালে বিষয়টি আমি তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারি। তিনি তখন একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে সেবা করছিলেন এবং একই সঙ্গে বাড়িতে স্কুলপড়ুয়া আরও দুই সন্তান ছিল। এমন পরিস্থিতিতে নিজের ছোটখাটো প্রেমের ব্যর্থতা কিংবা ভাই-বোনের সঙ্গে একটি পুরোনো মরিস ট্রাভেলার গাড়ি ভাগাভাগি নিয়ে সামান্য বিরোধকে সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে করা এক আত্মকেন্দ্রিক শিক্ষার্থীর জন্য তার সহানুভূতির ভাণ্ডারে সত্যিই আর কোনো জায়গা ছিল না। এসব কথা লিখতে গিয়েও আজ আমার নিজেরই লজ্জা লাগছে।

বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ পরিবারকেই—এমনকি রাজপরিবারকেও—নিজেদের মতো করে সত্য ও পুনর্মিলনের একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একটি সোপ অপেরায় বড় ধরনের মারামারির দৃশ্য যেমন উত্তেজনাপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি হৃদয়স্পর্শী হতে পারে এমন একটি দৃশ্য, যা আমাদের পরিচিত পারিবারিক মমতায় কাঁদিয়ে দেয়।

তাই আশা করি, হ্যারি, রাজা তৃতীয় চার্লস এবং বৃহত্তর উইন্ডসর পরিবার—সবাই যখন আবার ব্রিটেনে একত্রিত হচ্ছেন, তখন তাদের জীবনে এমন অনেক কোমল, আবেগঘন পুনর্মিলনের দৃশ্য তৈরি হবে। খবর দ্যা টেলিগ্রাফ