‘বহুবচন কেবল নাট্যদল নয়, একটি পরিবার’

‘চুয়ান্ন বছরের নাট্যযাত্রায় আমরা লোকজ থেকে বৈশ্বিক ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়েছি’ দীর্ঘ চুয়ান্ন বছরের সমৃদ্ধ নাট্য ঐতিহ্য নিয়ে পথ চলছে ঐতিহ্যবাহী নাট্যদল ‘বহুবচন’। আজ রবিবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে দলটির নতুন প্রযোজনা ‘অনিকেত সন্ধ্যা’। বার্ধক্যের অবহেলা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই নাটক, দলের পথচলা এবং আগামী ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন বহুবচনের দলীয় প্রধান, নাটকের প্রযোজনা অধিকর্তা ও মঞ্চের ‘মিসির আলী’ খ্যাত অভিনেতা তৌফিকুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অপূর্ব কুমার কুন্ডু ‘অনিকেত সন্ধ্যা’ নাটকটির প্রেক্ষাপট ও মূল দর্শন নিয়ে জানতে চাই।

দেখতে দেখতে আমার ও আমার দলের বয়সের খাতাটা বেশ ভারী হয়েছে। বয়স বাড়লে মানুষের দৈহিক সক্ষমতা কমে, কাজের পরিধি সংকুচিত হয়। নতুনকে বরণ করতে গিয়ে সমাজ পুরাতনকে কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও দূরে ঠেলে দেয়। এই দূরত্ব ও টগবগে জীবনের অবহেলায় মুষড়ে পড়ার যে ক্রন্দন, তা নিয়েই আমরা নাটক করতে চেয়েছিলাম। ভারতীয় নাট্যকার চন্দন সেনের লেখা ‘অনিকেত সন্ধ্যা’ আমাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছে। পারিবারিক ও সামাজিক অবহেলার শিকার প্রবীণদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দেয় এই প্রযোজনা। নাটকটির দর্শন হলো অসহায়কে সহায়তা দাও, যা দর্শকদের মানবিক হওয়ার এক নতুন দৃষ্টি দেবে।

বহুবচনের সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য ও নাট্যচর্চার পথচলা শুরু হয়েছিল কীভাবে?

দর্শকদের সামনে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকে সর্বপ্রথম মঞ্চে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয় বহুবচন। ১৯৭৩-৭৪ সালে তার উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ নাট্যরূপ দেওয়ার কাজ শুরু হয়। পরে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের নাট্যরূপ এবং মুজিব বিন হকের নির্দেশনায় ১৯৭৫ সালের অক্টোবরে মহিলা সমিতি মঞ্চে হুমায়ূন আহমেদের উপস্থিতিতেই নাটকটির শুভ উদ্বোধন হয়। প্রথম প্রদর্শনীতেই দারুণ প্রশংসিত হয় এটি। এমনকি বাংলাদেশ টেলিভিশনেও সম্প্রচার করা হয়। এই যে বহুবচনের হাত ধরে হুমায়ূন আহমেদের পথচলা শুরু হলো, এরপর আর কাউকেই পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

পরে তার ‘দেবী’ উপন্যাসটি মঞ্চে আনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

নব্বইয়ের দশকে আমরা হুমায়ূন আহমেদের ধানমন্ডির বাসায় গিয়ে তার ‘দেবী’ উপন্যাসটি মঞ্চায়নের ইচ্ছা প্রকাশ করি। তিনি অত্যন্ত উদার ও কৃতজ্ঞচিত্তে সম্মতি দিয়ে বলেছিলেন, আমার নাটক রচনার অনুপ্রেরণাতেই বহুবচন। তিনি আমাদের তার যেকোনো সৃষ্টি নাট্যরূপ দিয়ে মঞ্চায়নের পূর্ণ স্বাধীনতা দেন। পুরুষতান্ত্রিক লালসা, যৌন হয়রানি এবং মিসির আলীর কার্যকারণ ব্যাখ্যার বিষয়গুলো আমরা বিশ্বস্ততার সঙ্গে মঞ্চে ফুটিয়ে তুলেছি। এ পর্যন্ত ‘দেবী’র দেশ-বিদেশে ১২৫টি প্রদর্শনী হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা এখন ‘আমি ও আমরা’ নাটকটির কাজ করছি।

বহুবচনের ৫৪ বছর পেরোনোর এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও প্রাপ্তিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ফিরে তাকালে দেখি, থিয়েটার চর্চায় গর্ব করার মতো অনেক কাজ আমরা করেছি। আমাদের সূচনা স্লোগান ছিল, ‘আমাদের নাটক মানে শুধু নাটকীয়তা নয়, নাটকের চিরাচরিত আঙ্গিকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ’। এই ভাবনা আজও অটুট। হুমায়ূন আহমেদ কিংবা সেলিম আল দীনের মতো ব্যক্তিত্বদের সাহিত্যকর্ম প্রথম মঞ্চে আনার গৌরব আমাদেরই। লোকজ থেকে বৈশ্বিক, মৌলিক থেকে অনুবাদ সব বিষয়কেই আমরা আধুনিক আঙ্গিকে তুলে ধরেছি।

চুয়ান্ন বছর পূর্তির এই সুবর্ণ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বহুবচনের আগামীর পরিকল্পনা কী?

৫৪ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে আমরা এক ব্যাপক নাট্যোৎসবের আয়োজন করতে যাচ্ছি। নাটক যেহেতু জীবনেরই প্রতিফলন, তাই বহুবচন সর্বদাই নতুনত্বের সৃষ্টিতে বিশ্বাসী। যা একই সঙ্গে মানুষকে বিনোদিত করবে এবং জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করবে। বহুবচন কেবল একটি নাট্যদল নয়, এটি একটি পরিবার, যেখানে আমরা সবাই সবার সুখ-দুঃখের অংশীদার।