‘সান্ধ্য আইন’ বাতিলের দাবিতে উত্তাল জাবি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) শিক্ষার্থীদের চলাচল সংকুচিত করার অপচেষ্টা এবং নিরাপত্তার নামে হলে আবদ্ধ রাখার নীতির প্রতিবাদে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। সম্প্রতি জাহানারা ইমাম হল প্রশাসন রাত ১১টার মধ্যে হলে প্রবেশের বাধ্যবাধকতা ও প্রধান ফটকে তালা দেওয়ার সিদ্ধান্ত জারি করলে সাধারণ নারী শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিবাদের মুখে তা প্রত্যাহার করা হয়। তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, কেবল একটি নোটিস প্রত্যাহার নয়; বিতর্কিত ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শৃঙ্খলাসংক্রান্ত অধ্যাদেশ, ২০১৮’-এর ‘ন’ ধারা বাতিলই এখন তাদের মূল দাবি।

ঘটনার সূত্রপাত ও সম্মিলিত প্রতিবাদ : সম্প্রতি জাহানারা ইমাম হলের প্রোভোস্ট স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে নিরাপত্তার স্বার্থে রাত ১১টার মধ্যে ছাত্রীদের হলে প্রবেশের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের পর হলের প্রধান ফটকে তালা দেওয়ার কথাও জানানো হয়। এ সিদ্ধান্তে অনাবাসিক কিংবা দেরিতে ফেরা শিক্ষার্থীদের রেজিস্টারে নাম লেখা এবং বিভিন্ন কৈফিয়তের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যম ও ক্যাম্পাসজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত হল প্রশাসন বিজ্ঞপ্তিটি প্রত্যাহার করে। তবে শিক্ষার্থীরা এই সিদ্ধান্তকে আংশিক সফলতা হিসেবে দেখছেন। তাদের ভাষ্য, মূল সমস্যা সমাধান করতে হলে ২০১৮ সালের শৃঙ্খলা অধ্যাদেশের বিতর্কিত বিধানগুলো বাতিল করতে হবে।

‘২০১৮’-এর ‘ন’ ধারায় বলা হয়, হলে বসবাসরত ছাত্র/ছাত্রীকে রাত ১০টার মধ্যে নিজ নিজ আবাসিক হলে ফিরে আসতে হবে এবং ভোর ৫টার আগে আবাসিক শিক্ষকের অনুমতি ছাড়া হল ত্যাগ করা যাবে না। হলের প্রধান ফটক বন্ধ হওয়ার পর আগত ছাত্র/ছাত্রীদের প্রত্যাবর্তনের সময় লিপিবদ্ধ করা হবে এমন একটি রেজিস্টার খাতা হলসমূহের সমস্ত আবাসিক ভবনে আবাসিক শিক্ষকদের জিম্মায় থাকবে। যেসব ছাত্র/ছাত্রী ফটক বন্ধ হওয়ার পর হলে ফিরে আসবে তারা গেটে সংরক্ষিত রেজিস্টারে তাদের নাম, ফেরার সময় এবং তারা যে জায়গায় গিয়েছিল সে জায়গার নামসহ বিলম্বে ফেরার কারণ লিপিবদ্ধ করবে। এক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের অসত্য তথ্য প্রদান করা যাবে না। আবাসিক শিক্ষক প্রদত্ত তথ্য সন্তোষজনক বিবেচনা না করলে ছাত্র/ছাত্রীকে ডেকে কৈফিয়ত চাইতে পারবেন। দেরিতে প্রত্যাবর্তন নৈমিত্তিক অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট ছাত্র/ছাত্রীর সম্পর্কে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ব্যাপারটি প্রভোস্টের সামনে উপস্থাপন করা হবে।

‘মূল ব্যাধি এখনো রয়ে গেছে’ : জাতীয় ছাত্রশক্তির জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি জিয়াউদ্দিন আয়ান বলেন, “জাহানারা ইমাম হলের গেটে রাত ১১টায় তালা দেওয়ার নোটিস প্রত্যাহার শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রতিবাদের ফল। তবে সাময়িকভাবে একটি নোটিস প্রত্যাহার করাই যথেষ্ট নয়। ‘শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ ২০১৮’-এর সান্ধ্য আইনসহ শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চলাচল ও অধিকারকে সীমিত করে এমন বৈষম্যমূলক বিধানগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। নিরাপত্তার নামে শিক্ষার্থীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ না করে ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী, বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মতামত উপেক্ষা করে কোনো অযৌক্তিক বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ৪৯তম আবর্তনের শিক্ষার্থী সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া বলেন, ‘আমরা নিরাপদ জাহাঙ্গীরনগর চাই। কোনো নিয়ম যদি করতেই হয় তাহলে তা যেন যৌক্তিকতার মানদ-ে হয়, লৈঙ্গিক বৈষম্যের সূচকে নয়।’ তিনি বলেন, ‘শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ ২০১৮’-এর সান্ধ্য আইনের দোহাই দিয়েই মেয়েদের হলগুলোতে বারবার এমন নোটিস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ‘শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ ২০১৮’-এর সান্ধ্য আইনসহ বৈষম্যমূলক ও অযৌক্তিক সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো অবিলম্বে বাতিল ও পরিমার্জন করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।

ইতিহাস বিভাগের ৫৩তম আবর্তনের শিক্ষার্থী লামিশা জামান বলেন, ‘প্রশাসনের অন্যতম মূল দায়িত্ব হলো ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রশাসন যখন সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তখন নারী শিক্ষার্থীদের চলাফেরাকে একটি নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে এনে ফেলে। ২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধানে যুক্ত এই সান্ধ্য আইনকে আমরা প্রশাসনের ব্যর্থতা আড়াল এবং নারী শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের হাতিয়ার হিসেবে দেখি। অধিকাংশ নারী শিক্ষার্থী এর বিরোধিতা করেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধান থেকে এই আইন তুলে নেওয়ার সময় এসেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই প্রশাসনের উচিত শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকারের বিষয়টি বিবেচনা করে সান্ধ্য আইন বাতিল করা।’

জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকে আবাসিক শিক্ষার্থীদের হলে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। তারা বলেন, সান্ধ্য আইন জারি ও তা প্রয়োগের মানসিকতা এখনো নিন্দনীয়। নিরাপত্তার নামে নারী শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চলাচল, সহশিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তারা। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান সান্ধ্য আইনবিরোধী আন্দোলনের প্রতিও একাত্মতা প্রকাশ করেন তারা।

এসব সিদ্ধান্ত ও বিধিনিষেধের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে শুক্রবার পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে দুটি ছাত্র সংগঠন।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাবি সংসদ এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব সিদ্ধান্তকে বৈষম্যমূলক ও পিতৃতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির নেতারা বলেন, নিরাপত্তার বাহানায় নারী শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা খর্ব না করে ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ ঠেকানো, পর্যাপ্ত আলো ও সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা করে ২৪ ঘণ্টা কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। দাবি না মানলে তারা ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দেন।

পৃথক প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে ‘জাতীয় ছাত্রশক্তি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ’। সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক কাজী মেহরাব তুর্য স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে নেতারা অভিযোগ করেন, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের সময় আন্দোলন দমনে প্রণীত ‘শৃঙ্খলা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ, ২০১৮’-এর ‘ন’ ধারা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের চলাচল সীমিত করা হয়েছিল। তৎকালীন নিয়মে রাত ১০টার মধ্যে নিজ নিজ হলে ফেরা এবং সকাল ৫টার আগে হল ত্যাগ না করার বাধ্যবাধকতা ছিল। বর্তমান প্রশাসনও সেই একই নিয়ন্ত্রণমূলক ও পশ্চাৎমুখী মানসিকতা লালন করছে বলে তারা দাবি করেন এবং অবিলম্বে ২০১৮ সালের বিতর্কিত সান্ধ্য আইন পুরোপুরি বাতিলের দাবি জানান।