ফুটপাতের মাদকসম্রাট

মো. লালন, বয়স ৩৭; গুলিস্তানের জাতীয় স্টোডিয়ামের ৩-৪ নম্বর গেট-সংলগ্ন এলাকায় ছিন্নমূল মানুষ (ভাসমান) হিসেবে বাস করে। ২০১০ সালের ১১ জানুয়ারি প্রথম পুলিশের খাতায় নাম ওঠে তার। ওই দিন দুপুর ২টার দিকে পল্টন-গুলিস্তান জাতীয় স্টেডিয়ামের পূবালী ব্যাংকের শাখার সামনে থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। তার কাছ থেকে ৯০ পুরিয়া গাঁজা ও মাদক বিক্রির ১২০ টাকা উদ্ধার করা হয়। সেই বারই সবচেয়ে বেশি দিন কারাগারে থাকতে হয় তাকে। এরপর একে একে আরও ২৭টি মাদক ও নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলেও কিছু দিনের মধ্যেই ছাড়া পেয়ে যায় মাদকস¤্রাট লালন। কে তাকে জামিন করান, কার কাছ থেকে সে মাদক জোগাড় করে, সে বিষয়ে কিছু জানাতে পারেনি তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পল্টনে প্রবেশ করলেও গ্রেপ্তারের ভয়ে পাশর্^বর্তী এলাকায় সরে থাকে মাদককারবারি লালন। প্রথমবার জেল থেকে বের হয়েই সে ভাসমান নারী ও পুরুষদের নিয়ে একটি মাদকসেবন ও সরবরাহকারী গ্রুপ গড়ে তোলে । দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মাদক জোগাড় করে এসব ভাসমান মানুষদের সাহায্যে নিয়মিত চলে তার মাদকের কারবার। প্রথমবার মাদকসহ গ্রেপ্তারের পরই সতর্ক হয়ে যায় সে। এখন স্ত্রী ফাতেমা খাতুন এবং চক্রের লালচাঁন বাদশা, চাঁদনী, রেশমী, নিপা আক্তার, নয়ন, শামীম, কানন, হাসনা বেগম, টিটু হাওলাদার ও আল-আমিনসহ অর্ধশত সদস্য আছে তার দলে। গুলিস্তান স্টেডিয়াম-সংলগ্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ রাখতে ভাসমান নারী ফাতেমা খাতুনকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে তার মাধ্যমে মাদক কেনাবেচা করে লালন।

মামলার এজাহারে পুলিশ উল্লেখ করেছে, ভোলা জেলার চরফ্যাশন থানার উত্তর চরফ্যাশনের মৃত আবদুর রশিদের ছেলে লালন। গাঁজা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত সে। মাদক বিক্রির টাকা নিজ হেফাজতে রেখে আরও নানা অপরাধ করে বেড়ায় লালন। পল্টন মডেল থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ময়নুল ইসলাম মামলাটি করেন। সাক্ষী ছিলেন রামেল ও গিয়াস উদ্দিন নামের দুই ব্যক্তি। এর পর থেকে লালন যতবার পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে, নিজের পরিচয়ের ব্যাপারে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে।

সম্প্রতি পল্টন জাতীয় স্টেডিয়াম এলাকা থেকে পল্টন থানা-পুলিশ লালনকে গ্রেপ্তারের পর নতুন করে সে আবার আলোচনায় এসেছে। এবার তাকে কারাগারে দীর্ঘদিন আটক রাখার জন্য পল্টন থানা থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে আটকাদেশ দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়। বড় সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদী সংগঠনের নেতাদের ক্ষেত্রে সাধারণত এমন আবেদন করা হয়েছে। বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তির মাদক কারবারের জন্য জননিরাপত্তার হুমকি সৃষ্টি হয়েছে এবং জনগণের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা ডজনখানেক সুপারিশ করেছে।

মামলার রেকর্ডে দেখা গেছে, মাদক কারবারি লালনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ২৩টি, বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি ও মারামারির ঘটনায় চারটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে পল্টন থানায় একটি বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলাসহ ২২টি মামলা রয়েছে। মতিঝিল থানায় চারটি এবং মুগদা ও ডেমরা থানায় একটি করে মাদক মামলা রয়েছে।

পুলিশের তথ্য বলছে, তার বিরুদ্ধে ২৮টি মামলার ২৭টির তদন্ত রিপোর্ট দিয়েছে তদন্ত কর্মকর্তা। তারপরও কীভাবে লালন জামিন পায়? কারা জামিন করায় সে বিষয়ে কিছু জানা যায়নি।

সূত্র বলছে, ২০১০ সালে মাদকের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর ১২ জানুয়ারি ২০১৬ সাল পর্যন্ত আর গ্রেপ্তার হয়নি লালন। এরপর ওই বছরের ৩ ও ৮ ডিসেম্বর দুটি মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। ২০১৭ সালে একটি, ২০১৮ সালে দুটি, ২০১৯ সালে দুটি, ২০২০ সালে সাতটি, ২০২১ সালে দুটি, ২০২২ সালে দুটি, ২০২৩ সালে একটি, ২০২৪ সালে চারটি, ২০২৫ সালে একটি ও ২০২৬ সালে একটি মামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০২০ সালের ৪, ২১,২৫ ও ২৭ আগস্টে হয়েছে চারটি মামলা।

এসব মামলার এজাহার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মাদককারবারি লালন গত ২৭ জুন ৯ কেজি ও ২০০ পুরিয়া হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হয়েছে। এর আগে লালন বা তার চক্রের কোনো সদস্য এত মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়নি।

লালনের সহযোগী চাঁদনী ও রেশমীর বর্ণনা থেকে জানা গেছে, লালনের কাছ থেকে তারা মাদক কিনেছে। তারা জানায়, লালন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গাঁজা, ইয়াবা ও হেরোইন জোগাড় করে। তারপর রাজধানীর বিভিন্ন ফুটপাতে ভাসমান মানুষদের মাধ্যমে বিক্রি করে। সেসব জায়গার অন্যতম গুলিস্তান স্টেডিয়াম মার্কেটের গেটসংলগ্ন এলাকা। মাদককারবারি চক্রের সক্রিয় সদস্য লালন।

২০২০ সালের চারটি মাদক-মামলার তিনটিতে লালনকে পলাতক দেখায় পুলিশ। তবে এসব মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া শামীম, নয়ন, কানন, হাসনা, টিটু ও আল-আমিন জানায়, তারা লালনের কাছ থেকে মাদক জোগাড় করে। এরপর বিক্রি করার উদ্দেশ্যে গুলিস্তানে স্টেডিয়াম এলাকায় যায়। লালন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাদক জোগাড় করে তাদের কাছে পৌঁছে দেয়। সূত্র জানিয়েছে, বাড্ডা ও মুগদা এলাকায়ও ভাসমান মাদক-সিন্ডিকেট রয়েছে লালনের।

পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (সিডিএমএস) তথ্যেও গরমিল রয়েছে। লালন গ্রেপ্তার হওয়ার পর নিজের সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করত। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, স্থায়ী ঠিকানায় ভোলা সদরের পশ্চিম ইলিশা ও উত্তর চর ফ্যাশনের কথা বলা হয়েছে। পুলিশের খাতায় তাকে ভাসমান দেখানো হলেও, সে ডেমরা, মুগদা ও বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকার তথ্য দিয়েছে।

ডিএমপির মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) হুসাইন মুহাম্মাদ ফারাবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গুলিস্তান এলাকায় ভাসমান কিছু মাদকশারবারি রয়েছে, যাদের গ্রুপপ্রধান এই লালন। এখন পর্যন্ত সে পুলিশের হাতে ২৮ বারের বেশি গ্রেপ্তার হয়েছে। সাধারণত একটি মাদক মামলায় পুলিশ ১৫ দিন থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে চার্জশিট দেয়। লালনের বিষয়েও তার নামে থাকা সবকটি মাদক-মামলার চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ।

তিনি বলেন, ‘এবার তাকে দীর্ঘ আটকাদেশ দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে। সে আর কোথায় কোথায় ভাসমানভাবে মাদক সরবরাহ করে সে বিষয়েও খোঁজ রাখা হচ্ছে।’

পল্টন মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পল্টন থানা এলাকায় মাদক নির্মূলে কাজ করছি। এ এলাকায় কোনো মাদককারবারির জায়গা হবে না। লালনের বিষয়ে সবসময় সোর্সদের সর্তক রাখা হয়। তাকে দেখামাত্র ধরার নির্দেশ রয়েছে।’