জশনে জুলুসকে ঘিরে বর্ণিল সাজে চট্টগ্রাম

ঈদে মিলাদুন্নবী (স.) এর জশনে জুলুসকে ঘিরে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে এখন সাজ সাজ রব। নগরীর মূল সড়ক ও সড়ক দ্বীপগুলো সাজানো হয়েছে শত শত তোরণে। রঙ-বেরঙের পতাকা শোভা পাচ্ছে রাস্তায় রাস্তায়। দরবারে আলিয়া কাদেরিয়া সিরিকোটের সাজ্জাদনশীন পীর আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ’র নেতৃত্বে বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে এ জুলুস অনুষ্ঠিত হবে। ‘এয়া নবী সালাম আলাইকা’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হবে নগরীর রাজপথ।

হিজরী বর্ষ অনুসারে এবার জশনে জুলুসের ৫৫তম আয়োজন। বুধবার সকাল ৮টায় নগরীর ষোলশহর জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসা সংলগ্ন আলমগীর খানকাহ-এ কাদেরিয়া সৈয়দিয়া তৈয়বিয়া থেকে জুলুস শুরু হবে। এরপর নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়া মাদরাসা মাঠে মাহফিলে মিলিত হবে। সেখানে জোহরের নামাজের পর দোয়া ও মুনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। আল্লামা সাবির শাহ’র সঙ্গে এবারের জুলুসে সৈয়দ মুহাম্মদ কাশেম শাহ ও সৈয়দ মুহাম্মদ আকিব শাহ অতিথি হিসেবে থাকবেন। 

জশনে জুলুশের আয়োজক আনজুমান ট্রাস্টের মুখপাত্র এডভোকেট মোসাহেব উদ্দিন বখতেয়ার দেশ রূপান্তরকে জানান, চট্টগ্রাম ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার মানুষ জুলুসে যোগ দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে গাউছিয়া কমিটির বিভিন্ন শাখার ব্যবস্থাপনায় সেখান থেকে লোকজন আসবেন। এবারের জুলুসে প্রায় ৫০ লক্ষ লোকের সমাগম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত তিনি বলেন, ধর্মপ্রাণ সুন্নী মুসলমানদের কাছে জুলুসের গুরুত্ব ও আকর্ষণ দিন দিন বাড়ছে। গত ২৩ আগস্ট রাজধানী ঢাকায় আল্লামা সাবির শাহ’র নেতৃত্বে জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার সেখানেও অনেক বেশি লোক সমাগম হয়েছে।

জশনে জুলুস এর রুটসমূহ ঃ নগরীর পাঁচলাইশ থানাধীন জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা-বিবিরহাট (বামে মোড়)- মুরাদপুর (ডানে মোড়)-ষোলশহর ২ নম্বর গেইট- জিইসি মোড়- ওয়াসা-লালখানবাজার- টাইগার পাস (ডানে মোড়)। পূনরায় একই পথে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা সংলগ্ন জুলুস ময়দানে জমায়েত। জুলুসের সামনে বা পেছনে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মিডিয়ার গাড়ি ছাড়া অন্য কোন যানবাহন না চালানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। 

পার্কিং ব্যবস্থাপনা ঃ  জশনে জুলুসে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকে আগত লোকজনের বহনকারী যানবাহনসমূহ যাত্রী নামিয়ে নিম্ললিখিত পার্কিং পয়েন্ট সমূহের মধ্যে স্ব-স্ব সুবিধাজনক নিকটবর্তী স্থানে পার্কিং করবে। উত্তর চট্টগ্রাম থেকে আসা গাড়িগুলো এ কে খান মোড়, অক্সিজেন বাস টার্মিনাল, অনন্য আবাসিক এলাকা ও পুরাতন চান্দগাঁও থানা এলাকা। দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে আসা গাড়ি কর্ণফুলী ব্রিজ থেকে বাকলিয়া এক্সেস রোড ও পুরাতন চান্দগাঁও থানা। মহানগর (দক্ষিণ) থেকে আসা গাড়িগুলো দেওয়ান হাট এলাকায় সুবিধাজনক স্থানে পার্কিং করবে। জুলুস চলাচলের রুটে কোন প্রকার যানবাহন পার্কিং করা যাবেনা।

জুলুসে যা নিষিদ্ধ : এবারের জুলুসে কিছু বিষয় থেকে বিরত থাকার জন্য আনজুমান ট্রাস্টের পক্ষ থেকে সকলের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, জুলুসে সব ধরণের বাদ্য বাজনা বাজানো, হুজুর কেবলার ছবি কিংবা ছবি সম্বলিত ম্যাগাজিন, ট্যাবলয়েড বা মাসিক পত্রিকা বিক্রি করা, অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ও নারীদের জুলুসে অংশ গ্রহণ করা, জুলুস চলাকালীন খাবার ছুঁড়ে মারা ইত্যাদি। জুলুসে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা এবং আনজুমান ট্রাস্ট নির্ধারিত সবুজ পতাকা ছাড়া অন্যান্য কোন রঙের পতাকা ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। 

১৩৯৫ হিজরির (১৯৭৪ ইংরেজী) ১২ রবিউল আউয়াল থেকে চট্টগ্রামে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষ্যে জশনে জুলুস শুরু হয়। প্রথম জুলুসে নেতৃত্ব দেন আনজুমান ট্রাস্টের তৎকালীন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টে নুর মোহাম্মদ আলকাদেরী। তখন নগরীর বলুয়ারদীঘি পাড়ের খানকাহ এ কাদেরিয়া সৈয়দিয়া তৈয়্যবিয়া থেকে জুলুস বের হতো। পরবর্তী জুলুস শুরুর স্থান পরিবর্তন করে ষোলশহরস্থ জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়া সংলগ্ন আলমগীর খানকা শরীফে নিয়ে যাওয়া হয় ১৯৭৬ সালে কাদেরিয়া ত্বরিকার দিকপাল আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ বাংলাদেশে আসেন এবং জুলুসের নেতৃত্ব দেন। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বেই চট্টগ্রামে প্রতি বছর জুলুস বের হয়। এসময় জুলুসের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ১৯৮৭ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ এ জুলুসের নেতৃত্ব দেন। ২০২৪ সাল থেকে আল্লামা সাবির শাহ ঢাকা ও চট্টগ্রামে জশনে জুলুসের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। বর্তমানে এই জুলুস সুন্নী মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় আয়োজনে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম ও আশেপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে লাখো মানুষ জুলুসে অংশ গ্রহণ করে থাকেন।