ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুর কড্ডা এলাকায় গেলেই চোখে পড়ে সিটি করপোরেশনের সারি সারি ময়লার গাড়ি। মহাসড়কের ঠিক পাশেই প্রতিদিন ফেলা হচ্ছে শত শত টন বর্জ্য। ব্যস্ততম এই সড়কের ওপর গাড়ি থামিয়ে এভাবে ময়লা ফেলার কারণে দিন দিন তীব্র হচ্ছে যানজট, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক যোগাযোগ। গাজীপুরের ভোগরা কিংবা চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ধরে মাত্র চার কিলোমিটার এগোলেই দেখা মিলবে বর্জ্যরে এই বিশাল পাহাড়ের। দূর থেকেই চোখে পড়ে মহাসড়কের কোল ঘেঁষে জমে থাকা ময়লার স্তূপ, যার উচ্চতা ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ ফুটের কাছাকাছি পৌঁছেছে। প্রতিদিন নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িগুলো এসে এখানে বর্জ্য খালাস করে। ফলে দিন দিন এই স্তূপের উচ্চতা ও বিস্তৃতি বেড়েই চলেছে। দীর্ঘদিনের জমে থাকা এই বর্জ্যরে পাহাড় থেকে প্রতিনিয়ত চুইয়ে পড়ছে বিষাক্ত কালো পানি। বাতাসে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। ফলে পুরো এলাকায় এক অসহনীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, যা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আগে ময়লা পরিবহনের গাড়িগুলো নির্দিষ্ট বাইপাস সড়ক দিয়ে গিয়ে বর্জ্য ফেলে আসত। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচলে বড় ধরনের সমস্যা হতো না। কিন্তু বর্তমানে মহাসড়কের পাশে এবং একাংশ দখল করে ময়লার গাড়ি দাঁড় করিয়ে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। ফলে ব্যস্ততম এই মহাসড়কের একটি লেন কার্যত সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল ও উত্তরবঙ্গগামী এবং টাঙ্গাইলসহ উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকামুখী যানবাহনকে অনেকটা ধীরগতিতে চলাচল করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ময়লার গাড়ি আসা-যাওয়ার সময় যানজট আরও তীব্র হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ময়লা বহনকারী সিটি করপোরেশনের একাধিক গাড়ি মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গাড়ি থেকে বর্র্জ্য নামানোর সময় সড়কের একটি অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ব্যস্ততম ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় গাজীপুর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের জন্যও এ সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি ব্যস্ত মহাসড়কের পাশে ময়লার গাড়ি রেখে বর্জ্য ফেলার কারণে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
ময়লার পাহাড় থেকে ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধযুক্ত পানি : ময়লার পাহাড়ের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে এখান থেকে বের হওয়া দুর্গন্ধযুক্ত তরল বর্জ্য। দীর্ঘদিন জমে থাকা ময়লার স্তূপ থেকে বৃষ্টির পানি ও বর্জ্য মিশে তৈরি হচ্ছে কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত তরল। সেই পানি চুইয়ে পড়ছে মহাসড়কের ওপর। ফলে সড়কের পাশে কাদার সৃষ্টি হচ্ছে। যানবাহনের চাকার সঙ্গে কাদা ছিটকে পড়ছে পথচারী ও আশপাশের মানুষের শরীরে। পাশাপাশি পচা বর্জ্যরে দুর্গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্জ্যরে দুর্গন্ধের কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। আশপাশের দোকান, বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এর প্রভাব পড়ছে।
জনদুর্ভোগের সঙ্গে বেড়েছে বড় পোকা : ময়লার স্তূপে দীর্ঘদিন ধরে পচে থাকা বর্জ্যরে কারণে সেখানে মাছি, মশা ও বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ময়লার পাহাড় থেকে বড় বড় পোকামাকড় বের হয়ে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় দোকানদার আসলাম উদ্দিন বলেন, দুর্গন্ধে এখানে থাকা যায় না। কয়েকদিন ধরে সিটি করপোরেশনের গাড়ি এখানে থাকার কারণে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। ময়লার পাহাড় থেকে বড় বড় পোকা বের হচ্ছে। আমরা খুবই অস্বস্তিতে রয়েছি। সিটি করপোরেশন থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দা মেহেদী হাসান বলেন, এখানে ময়লা আসছে অনেক বছর ধরে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই ময়লার পরিমাণ বেড়েছে। মহাসড়কে ময়লার গাড়ি রাখা হচ্ছে। এতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলে এই ভোগান্তি আরও বাড়ে। মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে কিন্তু সিটি করপোরেশনের পদক্ষেপ নেই।
৫০ লাখ মানুষের নগরীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট : গাজীপুর সিটি করপোরেশনের আয়তন প্রায় ৩২৯ বর্গকিলোমিটার। বিশাল এই নগরীতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের বসবাস। এর পাশাপাশি রয়েছে প্রায় দুই হাজারের বেশি শিল্পকারখানা। বিপুলসংখ্যক মানুষ ও শিল্পকারখানা থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। কিন্তু এত বড় একটি শিল্পনগরীর জন্য পর্যাপ্ত ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ময়লা-আবর্জনার স্তূপ দেখা যাচ্ছে। অনেক জায়গায় নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা না থাকায় রাস্তার পাশে, খোলা জায়গায় কিংবা বিভিন্ন জলাশয়ের আশপাশে ময়লা জমছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে বর্জ্যরে সঙ্গে পানি মিশে দুর্গন্ধ আরও তীব্র হচ্ছে।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, সিটি করপোরেশনের ময়লা আবর্জনা পরিষ্কারের জন্য রয়েছে ৪৮৯ জন শ্রমিক। এছাড়াও ৫৭টি ওয়ার্ডে বর্জ্য বহনের জন্য ৫০টি গাড়ি রয়েছে। এসব গাড়িতে করে ময়লা সংগ্রহ করা হয়ে থাকে।
‘ময়লা ফেলার জায়গা নেই’ সিটি করপোরেশনে:
তবে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট জায়গার সংকটের কারণে সাময়িকভাবে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কাশিমপুর বর্জ্যরে সুপারভাইজার মো. ইমরান হোসেন বলেন, আমি ঘটনাস্থলে এসেছি দেখতে। যানজট রয়েছে, তবে এটা স্থায়ী হবে না। ময়লা ফেলা শেষ হলেই যানজট কমে যাবে। আমি এর বেশি কিছু বলতে পারব না, স্যারদের থেকে জেনে নেন কেন সমস্যা হচ্ছে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা জানান, আমরা ময়লা ফেলার বিকল্প জায়গা ব্যবস্থা করছি। ব্যবস্থা হলেই এই সমস্যা আর থাকবে না। আমরা বড় ধরনের ঝামেলায় পড়ে আছি। আমাদের গাড়ির কারণে যেন যানজট না লাগে এ জন্য লোকবল পাঠানো হয়েছে।