দুই বছর পরও কাটেনি ফুলগাজীর আতঙ্ক

বেড়ি বাঁধের ভাঙন, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টি এই তিনের মিলিত আঘাতে ২০২৪ সালের আগস্টে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বদলে গিয়েছিল ফেনীর চিত্র। সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছিল জেলার উত্তরের ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলা। মুহুরি, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি বেড়ে প্লাবিত হয় ফুলগাজীর ছয় ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা। কোথাও ঘরের একতলা, কোথাও দোতলা পর্যন্ত উঠে যায় পানি। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যায় অনেক এলাকায়।

সেই ভয়াবহ বন্যার দুবছর পূর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে বিধ্বস্ত অনেক ঘরবাড়ি ও সড়ক সংস্কার হয়েছে। কিন্তু দুর্যোগের ক্ষত পুরোপুরি মুছে যায়নি। বরং বর্ষা এলেই নতুন করে সামনে আসে আরেকটি প্রশ্ন আবার যদি উজান থেকে ঢল নামে, আবার যদি নদীর বাঁধ ভেঙে যায়? ফুলগাজীর মানুষের কাছে ২০২৪ সালের বন্যা তাই শুধু অতীতের একটি ঘটনা নয়; এটি এখনো আতঙ্কের স্মৃতি।

আট লাখ মানুষ পানিবন্দি, প্রাণহানি ২৮ : ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ফেনীর ছয় উপজেলায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি এবং ২০ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছিল। পরিস্থিতি আরও অবনতির পর জেলা প্রশাসনের হিসাবে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা প্রায় আট লাখে পৌঁছায়। বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে প্রাণহানির হিসাব। ৩ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসনের হিসাবে ফেনীতে মৃতের সংখ্যা ২৮ জনে দাঁড়ায়। এর মধ্যে ফুলগাজীতে সাতজন, ফেনী সদরে সাতজন, সোনাগাজীতে ছয়জন, দাগনভূঞায় তিনজন, ছাগলনাইয়ায় তিনজন ও পরশুরামে দুজনের মৃত্যু হয়। এই প্রাণহানি ও বিপুলসংখ্যক পানিবন্দি মানুষের পাশাপাশি ঘরবাড়ি, সড়ক, কৃষি, মৎস্য ও বাঁধে ব্যাপক ক্ষতি হয়।

পানি নামার পর শুরু হয় নতুন লড়াই : বন্যার সময় মানুষের প্রধান লক্ষ্য ছিল জীবন বাঁচানো। পানি নেমে যাওয়ার পর শুরু হয় ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম। বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি মেরামত করা, নষ্ট আসবাবপত্র সংগ্রহ, কৃষি ও ব্যবসায় ফিরতে গিয়ে অনেক পরিবারকে দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে হয়েছে। ফুলগাজীর দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা রাজু বলেন, বন্যার সময় ঘরবাড়িতে পানি ঢোকার পাশাপাশি সড়ক ভেঙে যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ত্রাণ পৌঁছানোও কঠিন ছিল। বন্যার সেই ভয় এখনো তাড়া করে। সড়ক ও বাঁধগুলো ভালোভাবে সংস্কার করা দরকার, যাতে সামান্য ঢলেই আগের পরিস্থিতি তৈরি না হয়। মুন্সীরহাট ইউনিয়নের নোয়াপুর গ্রামের জিয়া উদ্দিন বলেন, পানি এত দ্রুত বেড়েছিল যে অনেক পরিবার ঘরের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও পায়নি। পানি নেমে যাওয়ার পর ঘরবাড়ি ঠিক করা, নষ্ট জিনিসপত্র বদলানো এবং কাজে ফিরতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। জিএমহাট ইউনিয়নের উত্তর শ্রীচন্দ্রপুর গ্রামের খোকন বলেন, স্থায়ীভাবে বন্যার ঝুঁকি কমাতে নদী ও বাঁধের পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনব্যবস্থারও উন্নয়ন প্রয়োজন।

বাঁধ ভাঙলেই বাড়ে বিপদ : ফুলগাজীর বন্যা পরিস্থিতির সঙ্গে নদীর বাঁধের নিরাপত্তা সরাসরি জড়িত। ২০২৪ সালের আগস্টে মুহুরি, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বাঁধের একাধিক স্থান দিয়ে পানি প্রবেশ করে ফুলগাজী ও পরশুরামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। পরবর্তী সময়েও একই বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তিন নদীর বাঁধের ১৭টি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। ফলে ২০২৪ সালের ভয়াবহতার পরও নদীর বাঁধ ও পানি ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।

সড়কেও রয়ে গেছে বন্যার ক্ষত : বন্যার প্রবল স্রোতে ফুলগাজীর বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোথাও পিচ উঠে যায়, কোথাও সড়কের মাটি সরে গিয়ে তৈরি হয় গর্ত। এ বিষয়ে ফুলগাজী উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইসলাম হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের বন্যায় উপজেলার প্রায় সব ইউনিয়নের সড়কই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক চিহ্নিত করে বিভিন্ন স্কিম নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি সড়কের দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংস্কার করা হচ্ছে।

ঘরবাড়িতেও বড় ক্ষতি : বন্যায় ফেনী জেলায় হাজার হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের বন্যায় ৭০ হাজারের বেশি আধাপাকা ও কাঁচা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে শুধু ফুলগাজীতেই ২০০টি কাঁচাঘর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত এবং এক হাজার ৪৬৫টি কাঁচাঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যার পর ঘর মেরামত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তায় বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে। ইউএনডিপির পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় ফুলগাজীতে ১১০০ পরিবারকে ৩০ হাজার টাকা করে সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রীও দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মুন্সীরহাট ইউনিয়নে দ্বিতীয় পর্যায়ে ১২১টি পরিবারের মধ্যে গৃহস্থালি সামগ্রী বিতরণ করা হয়। তবে স্থানীয়দের মতে, সহায়তা পাওয়ার পরও অনেক পরিবার বন্যার আর্থিক ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

১৫৪২ কোটি টাকার প্রকল্পে আশার আলো : বন্যার স্থায়ী সমাধানে এবার বড় উদ্যোগ এসেছে। এক হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ফেনী জেলাধীন মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ অনুমোদন হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এটি উদ্বোধন করবেন। প্রকল্পের আওতায় মুহুরি ও কহুয়া নদীসহ সংশ্লিষ্ট জলাধারের ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পুনঃখনন, ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পুনর্বাসন ও শক্তিশালীকরণ এবং ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া আধুনিক হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্যাম, তিনটি নতুন রেগুলেটর, ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং ৭৭টি ইনলেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ফুলগাজী-পরশুরামের মানুষের কাছে প্রকল্পটি দীর্ঘদিনের বন্যা আতঙ্ক থেকে মুক্তির সম্ভাব্য পথ। ইউএনও মোহাম্মদ কাউছার হামিদ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো সংস্কারের পাশাপাশি দুর্যোগের সময় দ্রুত উদ্ধার, আশ্রয় প্রস্তুতি জোরদার করা হচ্ছে। মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ফেনীর উত্তরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।