চোখের সামনে ভেসে গেল পরিবার

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ভয়াবহ ভূমিধস ও বন্যায় হিমালয়ের কন্যাখ্যাত নেপাল যেন শোকের চাদরে ঢাকা পড়েছে। কেউ কেউ নিজের জীবন বাঁচাতে পারলেও, অনেকেই কিছু বুঝে ওঠার আগেই আকস্মিক এই বন্যার তোড়ে ভেসে যান। প্রবল এই ঢল তার গতিপথে পড়া দালানকোঠা, সেতু, যানবাহন সবকিছুই মুহূর্তের মধ্যে গ্রাস করে ফেলে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলা। এসব অঞ্চলে স্বজনহারাদের আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। গত বুধবারের এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৩৫৯ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। নেপাল-তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজ রয়েছে আরও দেড় সহস্রাধিক মানুষ, যাদের মধ্যে রয়েছে ৩৩ দেশের ৬৪৪ জন পর্যটক।

নুয়াকোট জেলার বাসিন্দা কল্পনা মল্লা কোনো রকম দৌড়ে বাড়ির ছাদে উঠে নিজের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। কিন্তু এই নারী চোখের সামনে তার পুরো পরিবারকে ভেসে যেতে দেখেছেন। কল্পনা বলেন, ‘আমার বাবা, মা, বোন এবং বোনের সন্তানেরা সবাই আকস্মিক ওই বন্যার তোড়ে ভেসে গেছেন। তারা বন্যার কবল থেকে বাঁচতে পারেননি; পালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না। এ বন্যা আমাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। আমি ও আমার ছেলে কোনোমতে একটি বাড়ির ছাদে উঠে প্রাণে বেঁচেছি কীভাবে বেঁচে গেলাম, তা নিজেরাও বলতে পারি না।’ কল্পনার ছেলে সুগম মাল্লা বলেন, তিনি হাত ধরে টেনে তার মাকে বাঁচিয়েছেন। আরেক নারী গোমা পণ্ডিত বলেন, বন্যায় তার মহিষসহ অন্যসব গবাদি পশু ভেসে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমার সব কৃষিজমি ভেসে গেছে। ১০ বস্তা শর্ষের বীজ, টন টন ভুট্টা ও ধান সব শেষ। কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।’

রাসুয়া জেলার ৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বড়াল বলেন, ‘ওটা কেবল পানি ছিল না। ছিল কাদার বিশাল এক স্রোত। সোজা আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল। স্রোত যতই কাছে আসছিল, ততই উচ্চতা বাড়ছিল।’ নেপালের চক্র দেব হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কেশব জানান, ভূমিধসের সময় তার স্ত্রী সঙ্গে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি স্ত্রীর হাত ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলাম। ওকে ছাদে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কাদার স্রোত ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমি কোনোমতে ছাদে উঠতে পেরেছিলাম। যাওয়ার আর কোথাও ছিল না। পালানোরও কোনো উপায় ছিল না, শুধু ওপরের দিকে ওঠা ছাড়া। আমার স্ত্রী এখন কাদার নিচে কোথাও রয়েছে। ও আর বেঁচে নেই।’

৩২ বছর বয়সী সুরজ শ্রেষ্ঠ যখন বুধবার সকাল ৯টার দিকে ত্রিশুলী-৩বি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ স্থান ত্যাগ করেন, তখনো জানতেন না এমন একটি বিধ্বংসী বন্যা আঘাত হানতে পারে। নুয়াকোটের কিষ্পাং গ্রামীণ পৌরসভা-৫-এ কর্মরত শ্রেষ্ঠ তার সহকর্মী গণেশ প্রসাইয়ের সঙ্গে ধুঙ্গে বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। প্রায় তিন কিলোমিটার যাওয়ার পর তারা দেখেন পানির স্রোত তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। গর্জনরত ও বৃদ্ধি পাওয়া পানির দৃশ্য ও শব্দে আতঙ্কিত হয়ে দুইজনই পাহাড়ি রাস্তার দিকে উঠে জীবন বাঁচান।

আমগাছে বাঁচল জীবন : বুধবার বিদুর এলাকায় একটি নবনির্মিত বাড়ির বাইরে শৌচাগারের জন্য গর্ত খুঁড়ছিলেন নেপালের ২৪ বছর বয়সী দিনমজুর বিবেক কুমাল। হঠাৎ পানি, কাদা ও পাথরের প্রবল স্রোত নেমে এসে তাকে এবং আশপাশের সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কাজ করার সময় হঠাৎ শোঁ শোঁ শব্দ শুনতে পান কুমাল। তখন প্রায় পাঁচ ফুট গভীর গর্তের ওপরে থাকা তার চার সহকর্মী তাকে দ্রুত উঠে দৌড়ে পালাতে বলেন। গর্ত থেকে কোনোমতে উঠে আসার আগেই তার সহকর্মীরা নিরাপদ জায়গায় চলে যান।

কাঠমান্ডুর ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টারের বিছানায় শুয়ে কুমাল বলেন, ‘আমি দৌড়াতে শুরু করি। এরপর ভূমিকম্পের মতো প্রচণ্ড শব্দে পানির বিশাল স্রোত নেমে আসে।’ এ সময় তার পাশে ছিলেন ভাই দিনেশ। কাদা ও ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে প্রবল স্রোত কুমালকে ভাটির দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। তবে একপর্যায়ে তিনি একটি আমগাছে আটকে যান। কুমাল বলেন, ‘ভাগ্য ভালো, আমি একটি আমগাছে আটকে গিয়েছিলাম। ওই আমগাছটি না থাকলে স্রোতে ভাসতে ভাসতে আমি মারাই যেতাম।’