ভোলার যোগাযোগে নতুন অধ্যায়, সড়ক না সেতু?ভোলাকে দেশের মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে প্রস্তাবিত ভোলা–মেহেন্দিগঞ্জ–হিজলা মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
এ উদ্যোগকে ঘিরে ভোলার যোগাযোগব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে সরকারের উদ্যোগে প্রস্তাবিত মহাসড়ক নির্মাণের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, অন্যদিকে সরাসরি ভোলা–বরিশাল সেতুর দাবিতে সোচ্চার হয়েছে ভোলাবাসীর একটি অংশ। ফলে গত কয়েক দিনে জেলার যোগাযোগের প্রশ্নে সামনে এসেছে দুটি প্রত্যাশা—প্রস্তাবিত মহাসড়ক, নাকি সরাসরি সেতু।
এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ভোলা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে প্রস্তাবিত ভোলা–মেহেন্দিগঞ্জ–হিজলা মহাসড়ক নির্মাণ সংক্রান্ত অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা প্রশাসন, ভোলার আয়োজনে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন ভোলার জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ডা. শামীম রহমান।
সভায় প্রস্তাবিত মহাসড়কের রুট, সম্ভাব্য সড়কপথ, নির্মাণের বিভিন্ন দিক, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও সম্ভাব্য সুফল নিয়ে আলোচনা করা হয়। ভোলা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইদুল ইসলাম প্রকল্পের বিভিন্ন অংশের তথ্য ও সম্ভাব্য সড়কপথের চিত্র তুলে ধরেন।
সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত প্রকল্পে হিজলা উপজেলা অংশে প্রায় ০.৮ কিলোমিটার, শান্তির হাট–চর অংশে ১.২ কিলোমিটার, মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা অংশে ৯ কিলোমিটার এবং ভোলা অংশে ৭ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের বিষয় রয়েছে। অর্থাৎ নতুন সড়ক নির্মাণের আওতায় প্রায় ১৮ কিলোমিটার অংশের প্রস্তাব রয়েছে।
এর আগে গত শনিবার (২২ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় ভোলার সঙ্গে ঢাকা ও বরিশালের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের বিষয়ে তিনটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে বরিশাল–রহমতপুর–হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ–ভোলা রুটে মহাসড়ক নির্মাণের প্রস্তাবটি গুরুত্ব পায়। ভোলাকে দেশের মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানানো হয়।
সরকারের এ উদ্যোগকে ভোলার যোগাযোগব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রস্তাবিত মহাসড়ক বাস্তবায়িত হলে ভোলা, মেহেন্দিগঞ্জ ও হিজলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের নতুন দ্বার খুলবে। পাশাপাশি ভোলা সরাসরি জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। কিন্তু সরকারের এই উদ্যোগের পরই সামনে আসে ভোলা–বরিশাল সরাসরি সেতুর দাবি।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) ভোলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ‘আমরা ভোলাবাসী’ সংগঠন। সেখানে সংগঠনের নেতারা স্পষ্ট করে বলেন, ভোলাকে সড়কপথে যুক্ত করার উদ্যোগের বিরোধিতা তাদের নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে ভোলার মানুষের জন্য কোন যোগাযোগব্যবস্থা সবচেয়ে দ্রুত, সরাসরি, কার্যকর ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে, তা কারিগরি ও অর্থনৈতিকভাবে মূল্যায়নের দাবি তাদের।
সংগঠনের সদস্যসচিব মীর মোশাররফ হোসেন অমি বলেন, তাদের দাবি কোনো ব্যক্তি, দল বা এলাকার বিরুদ্ধে নয়; ভোলার মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থেই তারা সরাসরি ভোলা–বরিশাল সেতু চান।
সংগঠনের নেতাদের যুক্তি, সরাসরি ভোলা–বরিশাল সেতু নির্মাণ করা গেলে ভোলা আরও সরাসরি দেশের মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। এতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সময় কমার পাশাপাশি গ্যাস, মাছ, ইলিশ, কৃষিপণ্যসহ সম্ভাব্য শিল্পপণ্য দ্রুত দেশের বিভিন্ন বাজারে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ভোলা–বরিশাল সেতুর দাবি অবশ্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ দাবি জানিয়ে আসছেন। এর আগে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনেও ভোলা–বরিশাল সেতুসহ বিভিন্ন দাবিতে কর্মসূচি পালন করেছে ‘আমরা ভোলাবাসী’। সরকারি পর্যায়েও এই সেতুর সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা ও সমীক্ষার বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
অন্যদিকে প্রস্তাবিত মহাসড়কের পক্ষে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হলো, ভোলাকে মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে এটি একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ। এই রুট বাস্তবায়িত হলে শুধু ভোলা নয়, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জের মানুষেরও যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে।
ভোলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইদুল ইসলাম সভায় প্রস্তাবিত রুটের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা, কারিগরি যাচাই ও অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
ভোলার অর্থনীতির জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। জেলার গ্যাসসম্পদ, মৎস্য ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং সম্ভাব্য শিল্পায়নের সঙ্গে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভোলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নাসির লিটনসহ বিভিন্ন মহলের প্রতিনিধিরাও এর আগে বলেছেন, দীর্ঘদিনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ভোলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। সড়ক বা সেতু—যে পথেই হোক, ভোলাকে দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।
আজকের অবহিতকরণ সভায় উপস্থিত বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনরাও প্রস্তাবিত মহাসড়ক বাস্তবায়িত হলে যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা প্রকাশ করেন।
সভায় ভোলার পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহ কাওসার, পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক মো. বেলাল হোসেন, ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজল চন্দ্র দাস, বিএনপির সদস্যসচিব মো. রাইসুল আলম, বাস মালিক সমিতির সভাপতি আমিন খান এবং সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান বাচ্চু মোলা, সাবেক পৌর চেয়ারম্যান আলহাজ্ব শফিউর রহমান কিরন, জেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি নারী সংগঠক খালেদা খানম, সদর উপজেলা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ আনোয়ার পারভেজ, বিজেপির সভাপতি আমিরুল ইসলাম রতন ও সাধারণ সম্পাদক মোতাছিম বিল্লাহ, এনসিপি নেতা মীর মোশাররফ অমি, ইসলামী আন্দোলনের সেক্রেটারি মাওলানা তরিকুল ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর আমির মাস্টার মোহাম্মদ জাকির হোসাইন এবং ভোলা প্রেসক্লাবের সভাপতি নজরুল হক অনু এবং সাধারন সম্পাদক নাসির লিটন, আজকের ভোলার সম্পাদক আলহাজ্ব শওকাত হোসেন, সংস্কৃতিকর্মী তালহা তালুকদার বাঁধনসহ সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে গত কয়েক দিনে ভোলার যোগাযোগের প্রশ্নে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সময়ে ভোলা–বরিশাল সরাসরি সেতুর দীর্ঘদিনের দাবিও নতুন করে জোরালো হয়েছে।
তবে দুই পক্ষের অবস্থানের ভেতরে একটি বিষয়ে মিল রয়েছে—ভোলাবাসী আর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকতে চায় না। তারা চায় দ্রুত, নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী যোগাযোগব্যবস্থা।
এখন মূল প্রশ্ন, প্রস্তাবিত ভোলা–মেহেন্দিগঞ্জ–হিজলা মহাসড়কই কি ভোলার দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে, নাকি এর পাশাপাশি সরাসরি ভোলা–বরিশাল সেতুর দাবিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নেওয়া হবে? ভোলার মানুষের প্রত্যাশা, বর্তমান প্রয়োজন ও আগামী দিনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে সরকার সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই যোগাযোগব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নেবে।