মাঠ ও শিক্ষা-দুইয়ের গল্প নিয়ে নাফীসের নতুন বই

একজন শিক্ষার্থীর জীবনে সাফল্যের জন্য সবথেকে বেশি প্রয়োজন পড়াশোনা নাকি খেলাধুলা? প্রশ্নটি শুনতে সহজ মনে হলেও এর উত্তর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমাজে এক ধরনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। অনেক পরিবারেই ভালো ফলাফলের জন্য খেলাধুলাকে সময়ের অপচয় হিসেবে দেখা হয়। আবার খেলাধুলায় আগ্রহী অনেক শিশুর ক্ষেত্রেও পড়াশোনাকে দ্বিতীয় সারিতে রাখার প্রবণতা দেখা যায়।

এই দুই ধারণার বাইরে গিয়ে পড়াশোনা ও খেলাধুলাকে একই সঙ্গে একজন মানুষের বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে 'প্লে অ্যান্ড স্টাডি, উইনস দ্য রেস' নামক বইয়ে। বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক শাহরিয়ার নাফীস ও এইচ এম আতিফ ওয়াফিকের যৌথভাবে লেখা বইটির মোড়ক উন্মোচন হবে শনিবার।

বইটির বিষয়বস্তু কোনো নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের জীবনী বা ক্রীড়া ক্যারিয়ারের গল্প নয়। বরং খেলাধুলার সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে লেখকেরা তুলে ধরেছেন, মাঠের শিক্ষা কীভাবে মানুষের ব্যক্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। এই কাজের জন্য প্রায় ৩৫ জন খেলোয়াড় ও ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিজ্ঞতা নেওয়া হয়েছে। তাদের জীবনে খেলাধুলার প্রভাব, পড়াশোনার সঙ্গে খেলাধুলার সমন্বয় এবং খেলোয়াড়ি জীবনে অর্জিত অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে কীভাবে কাজে এসেছে, এসব বিষয় উঠে এসেছে তাদের কথায়।

এর পাশাপাশি বইটির জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের কাছ থেকেও মতামত নিয়েছেন লেখকেরা। ফলে একই বিষয়কে দুই দিক থেকে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ক্রীড়াবিদদের অভিজ্ঞতায় যেমন এসেছে একজন খেলোয়াড়ের জন্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, তেমনি শিক্ষাবিদদের আলোচনায় উঠে এসেছে একজন শিক্ষার্থীর বিকাশে খেলাধুলার ভূমিকা।

বইটির পরিসরও বেশ বিস্তৃত। ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবল, অ্যাথলেটিকস, হকি এবং অন্যান্য খেলায় যুক্ত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা এতে স্থান পেয়েছে। ক্রীড়াবিদদের পাশাপাশি ক্রীড়া প্রশাসক, চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট এবং বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ব্যক্তিদের জীবনেও খেলাধুলার প্রভাব কীভাবে কাজ করেছে, তা তুলে ধরা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তিও বইটিতে জায়গা পেয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক ক্রিকেটার অ্যালেন ডোনাল্ড, বিশ্বকাপজয়ী কোচ স্টুয়ার্ট ল, নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট প্রশাসক ক্যাথরিন ক্যাম্পবেল এবং অলিম্পিক অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়ন ক্যাথি ফ্রিম্যানের কোচ জন কুইন। 

তবে বইটির গল্প শুধু সফল খেলোয়াড়দের ঘিরে নয়। বরং এর অন্যতম আকর্ষণ এমন কিছু মানুষ, যারা একসময় নিয়মিত খেলাধুলা করলেও শেষ পর্যন্ত পেশাদার খেলোয়াড় হননি। কেউ পরবর্তী সময়ে চিকিৎসক হয়েছেন, কেউ বেছে নিয়েছেন ফিজিওথেরাপিকে পেশা হিসেবে। তাদের জীবনে খেলাধুলার সেই সময়টুকু কী ধরনের মূল্যবোধ ও অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে, সেটিও বইয়ে গুরুত্ব পেয়েছে। এই বৈচিত্র্যের কারণেই বইটিকে কেবল ক্রীড়াবিষয়ক বই হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখানে মূলত মানুষের জীবনে খেলাধুলার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের বিভিন্ন দিক সামনে আনা হয়েছে। মাঠে পাওয়া অভিজ্ঞতা কীভাবে শৃঙ্খলা তৈরি করে, নেতৃত্বের গুণ বাড়ায়, দলবদ্ধভাবে কাজ করতে শেখায় কিংবা ব্যর্থতার পর আবার শুরু করার মানসিকতা গড়ে তোলে, সেসব বিষয় উঠে এসেছে বিভিন্ন মানুষের গল্পে।

বইটির পেছনের কাজও ছিল দীর্ঘ সময়ের। প্রায় তিন বছর ধরে তথ্য সংগ্রহ, সাক্ষাৎকার নেওয়া এবং পাওয়া অভিজ্ঞতাগুলোকে পাঠযোগ্য গল্পে সাজানোর কাজ করেছেন দুই লেখক। প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে ছোট ছোট গল্পের কাঠামোয় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তারা, যাতে পাঠকের কাছে এটি কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা না হয়ে বাস্তব জীবনের মানুষের গল্প হিসেবে ধরা দেয়। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য বইটির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ছোটবেলা থেকেই অনেককে এমন ধারণার মধ্যে বড় হতে হয় যে, পড়াশোনায় ভালো করতে হলে মাঠ থেকে দূরে থাকতে হবে। বইটির বিভিন্ন অভিজ্ঞতা সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। একই সঙ্গে এটিও দেখানো হয়েছে, খেলাধুলায় এগিয়ে যেতে চাইলেও শিক্ষার প্রয়োজন কমে যায় না।