দেড় বছরে হাজার দম্পতির বিচ্ছেদ

একসময় যে সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল একসঙ্গে পথচলার আজীবন অঙ্গীকারে, তা এখন সমাপ্তি টানছে আইনি নোটিসের কাগজে। নাটোরের গুরুদাসপুরে গত দেড় বছরে বিয়েবিচ্ছেদের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় এই সময়ে প্রায় ১ হাজার দম্পতির বিচ্ছেদ ঘটেছে। গ্রাম কিংবা শহর সবখানেই এখন একই চিত্র। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের মনোমালিন্য, পরকীয়া, মাদকাসক্তি, আর্থিক টানাপড়েন এবং পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণেই ভাঙছে এসব সংসার। পাশাপাশি বাল্যবিয়ে, পারস্পরিক বোঝাপড়ার ঘাটতি এবং সম্পর্কের প্রতি উদাসীনতাও এই বিচ্ছেদের পেছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউনিয়ন পরিষদ ও কাজী অফিসের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ ও ২০২৬ সালে তালাকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কোথাও তা দ্বিগুণ, কোথাও তিনগুণের কাছাকাছি। নাজিরপুর ইউনিয়নে ২০২৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ দম্পতির বিয়েবিচ্ছেদ হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। ২০২৪ সালে সেখানে এ সংখ্যা ছিল ৯৫। বিয়াঘাট ইউনিয়নে ২০২৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১০১টি, খুবজীপুরে ৯৫টি, মশিন্দায় ৯১টি, ধারাবারিষায় ৬৫টি এবং চাপিলায় ১০৮টি বিয়েবিচ্ছেদের তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে পৌর এলাকায় ২০২৫ সালে প্রায় ২০০ দম্পতির বিচ্ছেদ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রাররা জানিয়েছেন। তাদের মতে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে এসে তালাকের প্রবণতা আরও বেড়েছে।

উপজেলা কাজী কল্যাণ সমিতির সভাপতি ও বিয়াঘাট ইউনিয়নের কাজী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, তালাকের নোটিস পাওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রেই উভয় পক্ষকে নিয়ে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। পারিবারিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার সুযোগ থাকলে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সময়ে বিয়ে বিচ্ছেদের পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করছে না। পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক মূল্যবোধের সংকট, আস্থাহীনতা, আর্থিক চাপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগের কারণে সম্পর্কের দূরত্বও অনেক ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।

স্থানীয় প্রবীণ সাংবাদিক আলী আক্কাছ বলেন, দাম্পত্য সম্পর্কে আস্থা ও নিরাপত্তাবোধ কমে গেলে সম্পর্ক দ্রুত ভেঙে পড়ে। বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি।

উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা রেখামনি পারভিন মনে করেন, বিয়ের আগে কাউন্সেলিং চালু করা গেলে অনেক সমস্যার শুরুতেই সমাধান সম্ভব। তার ভাষায়, তরুণ-তরুণীদের মানসিক প্রস্তুতি, পারিবারিক দায়িত্ব এবং পারস্পরিক সম্মান সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা দেওয়া গেলে ভবিষ্যতে দাম্পত্য সংকট অনেকটাই কমতে পারে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, বাল্যবিয়ে ও মাদকাসক্তিসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার প্রভাব দাম্পত্য সম্পর্কেও পড়ছে। তিনি জানান, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে শুনানির মাধ্যমে উভয় পক্ষকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি বাল্যবিয়ে ও মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান চলমান রয়েছে। সংসার ভাঙার পেছনে প্রতিটি পরিবারের গল্প আলাদা। কিন্তু সংখ্যার এই দ্রুত বৃদ্ধি সামাজিক সংকেতও বহন করছে।