চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটা সিটি করপোরেশন বালক উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী দুর্জয় বিশ্বাস। পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য কোনো বইয়ের পাতায় তেমন একটা চোখ বোলানো হতো না তার। তবে নবম শ্রেণিতে উঠে বদলে যায় তার দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলা বইতে থাকা প্রমথ চৌধুরীর বিখ্যাত ‘বই পড়া’ প্রবন্ধটি পাঠের পর থেকেই বইয়ের জগতের প্রতি সে এক অচেনা আকর্ষণ অনুভব করে। কেবল পাঠ্যবইয়ের গন্ডিতে যে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়, তা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে দুর্জয়। এরপর আর দেরি নয়; বিদ্যালয়ের শিক্ষকের কাছ থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কর্মসূচির কার্ড সংগ্রহ করে ডানা মেলে সাহিত্যের জগতে। এক বছরেই তার পাঠ তালিকায় যুক্ত হয় চিরায়ত সাহিত্যের পাঁচটি বই।
গতকাল শুক্রবার নগরীর জিইসি কনভেনশন সেন্টারে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বর্ণাঢ্য পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে বই পড়ার পুরস্কার দেওয়া হয় দুর্জয় বিশ্বাসের মতো হাজারো শিক্ষার্থীকে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আয়োজনে ও গ্রামীণফোনের সহযোগিতায় আয়োজিত এই দিনব্যাপী উৎসবে চট্টগ্রাম মহানগরীর ১০১টি স্কুলের মোট ৫ হাজার ৮৯৫ জন কৃতী শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া হয়। অর্পণাচরণ সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে পরিবেশিত জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে সূচনা ঘটে আলোর এই আয়োজনের।
দুর্জয়ের মতোই ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে টানা বই পড়ে এবারও পুরস্কার জিতে নিয়েছে তার সহপাঠী আব্দুল্লাহ আল সাজিন। আবার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ পড়ে পুরস্কার হাতে হাসিমুখে বাড়ি ফিরছিলেন পাঠানটুলী খান সাহেব সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির তুলসী দে তুষি। অন্যদিকে জসীম উদ্দীনের ‘বাঙালির হাসির গল্প’ পড়ে পুরস্কারের আনন্দে উল্লাসে মেতেছিলেন আলকরণ সুলতান আহমেদ দেওয়ান সিটি করপোরেশন স্কুলের দুই বান্ধবী রেণু আকতার ও ওশ্মী চৌধুরী।
উৎসবের এই বিশাল ক্যানভাসে বছরজুড়ে বই পড়ে মূল্যায়নের মাধ্যমে তিনটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া হয়। যার মধ্যে ৪ হাজার ৬১৬ জন ‘শুভেচ্ছা’, ১ হাজার ১৫০ জন ‘অভিনন্দন’ এবং ১২৯ জন ‘সেরা পাঠক’ ক্যাটাগরিতে পুরস্কার অর্জন করেন। বিজয়ী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১ হাজার ৭৫২ জন ছেলে ও ৪ হাজার ১৪৩ জন মেয়ে।
নগরীর ৯৪টি স্কুলের শিক্ষার্থীরা সরাসরি মঞ্চ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করলেও বাকি সাতটি স্কুলের ৩০৮ জন শিক্ষার্থীর পুরস্কার তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের সংগঠকের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
পুরস্কার বিতরণ পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, নিজেদের মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে বই পড়ার শিক্ষাকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ও ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি প্রকল্পের পরিচালক মু. বিল্লাল হোসেন খান শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে আলোকিত মানুষ হতে সুস্থ মস্তিষ্কের বইপড়ুয়া হওয়ার প্রতি জোর দেন।
একই সঙ্গে মোবাইল ফোনের অপব্যবহার রোধ করার আহ্বান জানিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি অধ্যাপক মুহাম্মাদ আলী নকী বলেন, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস পৃথিবীর ইতিহাস ও সংস্কৃতি জানার পাশাপাশি নিজেকে জানার বড় মাধ্যম।
অনুষ্ঠানে উদ্দীপনামূলক বক্তব্য রাখেন গ্রামীণফোনের চট্টগ্রাম রিজিওনাল হেড মো. মিনহাজ উল আলম, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা কিসিঞ্জার চাকমা, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ডা. আবদুন নূর তুষার ও সংগঠক অধ্যাপক আলেক্স আলীম প্রমুখ।
প্রথাগত বই পড়ার বাইরে এ বছর প্রথমবারের মতো উৎসবে যুক্ত করা হয় ‘অনলাইন সেফটি ফান্ডামেন্টালস’ শীর্ষক কোর্স ও বিশেষ সেফটি কর্নার। এটি অভিভাবক ও শিশু-কিশোরদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের তথ্য ও দিকনির্দেশনা দেয়।