চাঁদনি রাতে হারিকেনের আলোয় পুঁথি পাঠের আসর

আধুনিকতার ঝলমলে আলো আর ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যস্ততাকে দূরে ঠেলে ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতিতে মেতে উঠেছিল পাবনার চাটমোহর। কৃত্রিম আলোকসজ্জা এড়িয়ে ওপরের মুক্ত আকাশে রুপালি চাঁদের আলো আর নিচে হারিকেন ও কুপিবাতির আবছা মায়াজালে আয়োজন করা হয় এক গ্রামীণ পুঁথি পাঠের আসর। সুরেলা কণ্ঠের জাদু দিয়ে শ্রোতাদের শিকড়ের টানে ফিরিয়ে নিয়ে যান নব্বই দশকের শিল্পী আসাদুজ্জামান দুলাল ও লইমুদ্দিন প্রামাণীক।

​গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে চাটমোহর বিলচলন ইউনিয়নের সোনাহার পাড়ার কিতাব প্রামাণিকের বাড়িতে বসে ঐতিহ্যবাহী এই আসর। ঘড়ির কাটায় রাত নয়টা বাজার আগেই সোনাহারসহ আশপাশের গ্রামগুলো থেকে শত শত তরুণ, প্রবীণ ও সব বয়সী নারীরা সেখানে ভিড় জমান। রাত নয়টা থেকে শুরু হয়ে সাড়ে দশটা পর্যন্ত চটের চাদর ও মাদুর বিছানো প্রাঙ্গণে চলে এই পরিবেশনা।

​আসরে গায়েন তার আকুল কণ্ঠে পরিবেশন করেন বাংলা লোকসাহিত্যের জনপ্রিয় কাব্য ‘বিবি সোনাভান’ ও ‘গাজীকালু চম্পাবতী’র পুঁথি। হারিকেনের মৃদু আলোর শিখা আর গায়েনের সাবলীল সুরের মায়াজালে নিমেষেই যেন চারপাশ কোলাহলমুক্ত হয়ে যায়। গায়েনের সংলাপে মুগ্ধ হয়ে তরুণদের চোখ নেমে আসে মুঠোফোনের পর্দা থেকে। প্রবীণরা ফিরে যান তাদের শৈশব-কৈশোরে, আর নবীনরা প্রত্যক্ষ করেন খাঁটি সুর ও গ্রামীণ আবহমান ঐতিহ্যের আত্মিক শান্তি।

​অনুষ্ঠানে আসা তরুণ আশরাফুল ও মাছুমা জানান, এর আগে বইয়ের পাতায় পুঁথি পাঠের কথা পড়লেও বাস্তবে দেখার সুযোগ হয়নি। আলো-আঁধারির এই আবহ ও মহীয়সী নারী সোনাভানের গল্প তাদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। 

স্থানীয় বাসিন্দা আকাশ ও প্রবীণ আক্কাস আলী জানান, প্রযুক্তির যুগে হারিয়ে যাওয়া এসব আদি সংস্কৃতি আমাদের শিকড়কে মনে করিয়ে দেয়। তরুণদের মাঝে ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে এমন আয়োজন আরও হওয়া প্রয়োজন।

​এ বিষয়ে আয়োজক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ড. এস. এম আতিকুল আলম বলেন, ১৭-১৮ শতকে শুরু হওয়া এই সাহিত্য আশি-নব্বই দশকের দিকে বিলুপ্তির পথে চলে যায়। নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের আদি সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে এবং লোকজ ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করতেই হারিয়ে যাওয়া শিল্পীদের এনে এই আয়োজন। এ সময় আসরে অংশ নেওয়া তিন জন আদি পুঁথি পাঠককে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়।

​বিলচলন ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আধুনিকতার যুগেও লোকজ সংস্কৃতির এই চর্চা প্রমাণ করে বাঙালি তাঁর অতীত ভুলে যায়নি। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এমন আয়োজন অব্যাহত রাখার দাবি জানান স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীরা।