জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। এদিকে বাংলাদেশ জোরপূর্বক গুম থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশনে (ICPPED) যোগদানের দুই বছর পূর্ণ করেছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্য, সংসদ সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, কূটনীতিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অধিকারের পরিচালক (প্রোগ্রামস) সাজ্জাদ হোসাইন। অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্য দেন অধিকারের পরিচালক (অ্যাডভোকেসি) তাসকিন ফাহমিনা। তিনি জোরপূর্বক গুমের পরিস্থিতি ও এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
সভায় বাগেরহাটের মিরাজ শেখের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর জোরপূর্বক গুমের প্রথম শিকার মিরাজ শেখ। ১০ এপ্রিল ২০২৬ তাকে গুম করা হয় এবং এখন পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সভায় তার স্ত্রী, মা, সন্তান ও বোন উপস্থিত ছিলেন। মিরাজ শেখের স্ত্রী কোস্ট গার্ডের হাতে তার স্বামীকে অপহরণের ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন। একই সঙ্গে মিরাজ শেখের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ এবং তাকে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানান।
তিনি বলেন, মিরাজ শেখ গুম হওয়ার পর থেকে তার পরিবার গুরুতর আর্থিক সংকট, সামাজিক চাপ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাপসহ নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছে।
অধিকারের ইন্টার্ন এবং জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তির কন্যা আনিশা ইসলাম ইনশা ২০১৯ সালে মিরপুর থেকে তার বাবাকে অপহরণের ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি তার পরিবারের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা সামাজিক চাপ, আর্থিক সংকট এবং মানসিক ট্রমার কথা বর্ণনা করেন।
আনিশা ইসলাম ইনশা বলেন, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে জোরপূর্বক গুমের বিচার নিশ্চিত করার পরিবর্তে রাষ্ট্র এখনো এটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও জোরপূর্বক গুম থেকে বেঁচে ফেরা মীর আহমাদ বিন কাসেম ‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এর খসড়াকে ‘আবর্জনা আইন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তার অভিযোগ, প্রস্তাবিত আইনটি সংবিধান-স্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে এবং আইনি প্রতিকারের সুযোগ সীমিত করে।
ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় আন্তঃসংস্থা তদন্ত কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, এ ধরনের ঘটনায় একাধিক রাষ্ট্রীয় সংস্থার পারস্পরিক সহযোগিতা থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনও ‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’-এর খসড়ার সমালোচনা করেন।
বিশেষ করে প্রমাণিত নয়—এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন তিনি। একই সঙ্গে আন্তঃসংস্থা তদন্ত ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনা উল্লেখ করে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, আদালতে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিনিধিরা এ ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছিলেন। তবে তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
সভায় জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং চলমান সংকটের কথা তুলে ধরেন।
আমেনা আক্তার বৃষ্টি জানান, ১৪ বছর আগে তার স্বামী ও ভাশুর গুম হওয়ার পর তাদের পরিবার আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে তারা বিভিন্ন সামাজিক প্রতিবন্ধকতারও শিকার হন। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্ত করানো কাঠামোগতভাবেই অযৌক্তিক।
ইউনাইটেড ফর দ্য ভিকটিমস অব এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স (UVED)-এর সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. মারুফ জামান বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে (NHRC) একটি স্বাধীন তদন্ত সংস্থা হওয়া প্রয়োজন।
তার মতে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আটককেন্দ্রগুলো ও সংশ্লিষ্ট নথিতে অবাধ প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। একই সঙ্গে কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি জোরপূর্বক গুম থেকে বেঁচে ফেরা কোনো ব্যক্তি অথবা ভুক্তভোগীর পরিবারের একজন সদস্যের জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে একটি পদ সংরক্ষণের প্রস্তাব দেন।
ভয়েস অব এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স পারসন্স (VOED)-এর আবদুল কাইয়ুম ২০১৭ সালে র্যাব-১১-এর হাতে তার অপহরণের ঘটনা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় হয়রানির আশঙ্কায় জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (OHCHR) কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন বাংলাদেশের জাতীয় আইনগত কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের মধ্যে বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ICPPED-এ বাংলাদেশের যোগদানের পর গত দুই বছরে সংঘটিত জোরপূর্বক গুমের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করে আগামী মাসে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে জমা দিতে হবে।
আলোচনা সভা থেকে ‘অধিকার’ সরকারকে ‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া সংশোধনের জন্য জোরালো আহ্বান জানায়।
অধিকারের মতে, খসড়াটির বর্তমান রূপ জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপসহ ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুতর বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
সংগঠনটি জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি সংহতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।