বিয়ে, বিচ্ছেদ ও পুনর্বিয়ে কোনোটিরই নেই নিবন্ধন

১৬ বছর বয়সেই দুবার বিয়ে হয়েছে বাড়িনগর গ্রামের এক কিশোরীর। প্রথম সংসার টেকেনি, বিচ্ছেদের ছয় মাসের মধ্যেই দ্বিতীয় বিয়ে। এখন তিনি আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের আরও অনেক কিশোরীর জীবনেও বিয়ে, বিচ্ছেদ ও পুনর্বিয়ের এমন চক্র দেখা যাচ্ছে।

সরকারি প্রচার-প্রচারণা, আইন প্রয়োগ কিংবা প্রশাসনের অভিযানের প্রভাব এখনো পৌঁছায়নি রাজশাহীর পদ্মার চরাঞ্চলে। গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নে অধিকাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সেই। এসব বিয়ের অধিকাংশেরই কোনো নিবন্ধন হয় না; স্থানীয় ইমাম বা মৌলভীর মাধ্যমে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় সম্পন্ন হয়। নিবন্ধন না হওয়ায় বিয়ে ও বিচ্ছেদের প্রকৃত সংখ্যা কোনো সরকারি দপ্তরেই নেই।

প্রায় ৪০ হাজার মানুষের ইউনিয়ন চর আষাড়িয়াদহে ১৮ বছর হওয়ার আগেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়াকে অনেক পরিবার স্বাভাবিক এবং নিরাপদ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখে। স্থানীয়দের দাবি, এ এলাকায় ১৭ বছর পার হওয়ার পর বিয়ে হয়েছে, এমন মেয়ে খুঁজে পাওয়া কঠিন।

এক মাসের চার বিয়েই বাল্যবিয়ে : চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের তিন গ্রামে চলতি আগস্ট মাসে চারটি বিয়ের তথ্য এসেছে এই প্রতিবেদকের হাতে। এর মধ্যে চরটিই বাল্যবিয়ে। এ বিয়েগুলো হয়েছে পারিবারিকভাবে আয়োজনই করে। কোনো গোপনীয়তা ছিল না। এর মধ্যে টাকপাড়া গ্রামের আকবর আলীর ছেলে ইমরান হোসেনের বয়স ১৭ বছর। একই গ্রামের মোজাম্মেল হকের মেয়ে উম্মে কুলসুমের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। কুলসুমের বয়স ১৩ বছর। ভুবনপাড়া গ্রামের আমজাদ হোসেনের ছেলে আঙ্গুর হোসেনের বয়স ১৬ বছর। তিনি বিয়ে করেছেন প্রেমতুলি গ্রামের মাহফুজ রহমানের মেয়ে ১৪ বছর বয়সী খাদিজা খাতুনকে। নতুন গ্রামের মোজাম্মেল হোসেনের ছেলে সাহেব আলীর বয়স ১৭ বছর। তিনি টেকপাড়া গ্রামের আমজাদ হোসেনের মেয়ে সুমিকে বিয়ে করেছেন। সুমির বয়স ১৬ বছর। ভুবনপাড়ার ইসরাক আলীর ছেলে বিদ্যুৎ হোসেনের বয়স ১৮ বছর। নতুন গ্রামের আব্দুল মালেকের মেয়ে ফাতেমার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। ফাতেমার বয়সও ১৬ বছর।

বাংলাদেশের আইনে নারী ১৮ বছর এবং পুরুষ ২১ বছর পূর্ণ না করলে তাকে বিবাহের ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক ধরা হয়; এক পক্ষ বা উভয়পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে সেটি বাল্যবিবাহ।

বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার প্রকট : চর আষাড়িয়াদহের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার প্রকট। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কানাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে মাত্র ৩৭ জন। এই  বেচের শিক্ষার্থীরা ২০২১ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল ১৯০। নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করে ৮৫ জন। অর্থাৎ তিন বছরের মধ্যে ঝরে পড়েছে ১০৫ জন। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি। ছেলেদের স্কুলে উপস্থিতির হার কম। সে তুলনায় মেয়েদের উপস্থিতির হার ভালো। আগ্রহও বেশি, কিন্তু চরাঞ্চলের অনেক পরিবারে মেয়ের বয়স একটু বাড়লেই বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এ কারণে অনেক মেধাবী ও আগ্রহী শিক্ষার্থীও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। মেয়েদের ঝরে পড়ার প্রধান কারণ বাল্যবিয়ে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই অনেক মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়।

অসময়ের বিয়ে ভেঙেও যাচ্ছে : যে বয়সে মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সেই তাদের সংসারের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। অনেকেরই সংসার সম্পর্কে কোনো ধারণা তৈরি হওয়ার আগেই বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে। অল্প বয়সে বিয়ের কারণে অনেক সংসারে দাম্পত্য কলহ তৈরি হচ্ছে। বয়সের ব্যবধান, পারিবারিক মতবিরোধ ও সংসারজীবনের বাস্তবতা অনেক কিশোরীর জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই বিরোধ বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়াচ্ছে। এরপর আবারও দ্রুত তাদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে অল্প বয়সেই তারা বিয়ে, বিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের বহু কিশোরীর জীবন একই চক্রেই বাধা। ঘটনাগুলো এখানে একেবারেই স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

বাড়িনগর গ্রামের ১৬ বছর বয়সী এক মেয়ের সন্ধান মেলে যার এরই মধ্যে দুই বিয়ে হয়ে গেছে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৫ বছর বয়সে একই ইউনিয়নের ১৯ বছর বয়সী ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। কিন্তু সেই সংসার বেশি দিন টেকেনি। পারিবারিক কলহের কারণে বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর ছয় মাস না পেরোতেই আবারও তার বিয়ে হয় ২২ বছর বয়সী ছেলের সঙ্গে। এখন তিনি আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। যে বয়সে তার পড়াশোনা, খেলাধুলা আর স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার কথা ছিল, সেই বয়সেই তিনি দ্বিতীয় সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন। পরিবারও বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। তাদের কাছে মেয়ের একটি সংসার হয়েছে, সেটিই বড় স্বস্তি।

একই ধরনের জীবনকাহিনি নতুন গ্রামের আরেক মেয়ে আয়শার। নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার আগেই ১৫ বছর বয়সে তার বিয়ে হয় পাশের গ্রামে। তার সংসার টিকেছিল মাত্র দুই মাস। বনিবনা না হওয়ায় বিচ্ছেদ হয়। এরপর আড়াই মাসের মধ্যেই পরিবারের পক্ষ থেকে অন্যত্র আবারও তার বিয়ে দেওয়া হয়। এখন তার কোলে দুই মাস বয়সী একটি কন্যাশিশু।

বিয়ের নিবন্ধন হয় না : স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানকার বিয়ের অনেক ক্ষেত্রেই শুধু একজন মৌলভীকে ডেকে এনে বিয়ে পড়ানো হয়। অনেক সময় কাজী উপস্থিত থাকেন না। আবার কাজী থাকলেও ১৮ বছরের নিচে বিয়ে নিবন্ধন না করার বিধান মানা হয় না। কম বয়সে হওয়া বিয়ের তথ্য অনেক সময় আলাদা খাতায় সংরক্ষণ করা হয়। স্বাভাবিক বয়সে হওয়া বিয়ের তথ্য যে খাতায় তোলা হয়, সেখানে এসব তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।

কখনো কখনো কোনো বাল্যবিয়ের খবর প্রশাসনের কাছে পৌঁছায়। তখন বিয়ে সাময়িকভাবে বন্ধও করা হয়। কিন্তু কয়েক দিন পর আবার মৌলভী ডেকে সেই বিয়ে সম্পন্ন করা হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

নিবন্ধন না থাকার কারণে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। একজন অভিভাবক জানান, তার মেয়ের বিয়ের সময় বয়স ছিল ১৭ বছর। কাজী বিয়ে পড়ালেও নিবন্ধন করেননি। কিছুদিন পর মেয়ের বিয়ে ভেঙে গেলে নিবন্ধনের কাগজ আনতে গেলে মেয়ের বয়স কম থাকার অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়। নিবন্ধন না থাকার কারণে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার কোনো আইনি প্রতিকার বা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেননি।

চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল হাই বলেন, ইউনিয়ন পরিষদে প্রতি শনিবার গ্রাম আদালত বসে। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই সেখানে বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত কোনো না কোনো মামলা আসে। তার ভাষ্য, বাল্যবিবাহ ঠেকাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুই পরিবারের সম্মতিতে গোপনে অনেক বিয়ে হয়ে যায়। পরে সেসব সংসারের অনেকগুলোই দাম্পত্য কলহ ও বিচ্ছেদে গড়ায়। তিনি আরও বলেন, বয়স না হলেও কোনো না কোনোভাবে কাজীরা বিয়ে পড়িয়ে দেন। অনেক সময় গ্রামের মাওলানারাও এ কাজে যুক্ত থাকেন।

চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের কাজী মো. শামসুল হকের বক্তব্য জানতে মোবাইলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরলেও সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কথা বলেননি।

দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বাল্যবিবাহের শাস্তি সর্বোচ্চ দুবছরের কারাদণ্ড। এ শাস্তি পিতামাতা বা বর-কনে সবার জন্য হতে পারে। এমনকি বিয়ে পরিচালনাকারী কাজীরও একই শাস্তি হতে পারে।

গোদাগাড়ী উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, বাল্যবিয়ের কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। প্রশাসনের নজরে আসে বা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে যেসব ঘটনা প্রতিরোধ করা হয়, শুধু সেগুলোর তথ্যই সংরক্ষিত থাকে।

গোদাগাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ হাসানুল জাহিদ বলেন, হাসপাতালে সন্তান প্রসবের জন্য আসা অনেক মায়ের বয়সই ১৮ বছরের নিচে, যা বাল্যবিয়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। কিন্তু অধিকাংশ বিয়ে নিবন্ধিত না হওয়ায় নির্ভুল পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন।

গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান বলেন, বাল্যবিয়ের খবর পেলেই প্রশাসন তা বন্ধে উদ্যোগ নেয়। তবে অনেক বিয়ে নিবন্ধন ছাড়া সম্পন্ন হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গত দুই মাসে অন্তত চার থেকে পাঁচটি বাল্যবিয়ে বন্ধ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।