উদ্ধারকাজে বিদেশিদের অনুমতি দিল নেপাল

হিমবাহধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত নেপালে দুর্যোগপরবর্তী অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম চলছে। কাঁদা-পাথরের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা মরদেহের সংরক্ষণ ও পরিচয় শনাক্তকরণ নিয়ে চরম হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত বদলে বিভিন্ন দেশের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলকে কাজ করার অনুমতি দেওয়ার কথা জানিয়েছে নেপাল সরকার। গতকাল শনিবার নেপালের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কাঠমান্ডু পোস্টকে বলেন, ‘আমরা নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমিতসংখ্যক বিশেষজ্ঞকে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছি।’ তিনি জানান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল এবং কিছু বিশেষজ্ঞকে কাজ করার অনুমতি দেওয়ার জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক চাপের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ এ দুর্যোগে তাদের নাগরিকরাও নিখোঁজ রয়েছেন। প্রলয়ঙ্করী ওই ঢলের পর নিহতের সংখ্যা বাড়ছেই। এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন এবং ৬৬৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোকবাহাদুর ছেত্রী গত শুক্রবার বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে সহায়তার প্রস্তাব আসাটা স্বাভাবিক, তবে আমাদের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। আপাতত আমাদের এ ধরনের সহায়তার প্রয়োজন নেই।’ তবে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের (এনডিএমসি) মূল্যায়নের ভিত্তিতে নেপাল সরকার আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে ভারত, চীন, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি দল পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এসব দলের সদস্যরা টানেল থেকে উদ্ধারকাজ এবং ডিএনএ ও ফরেনসিক পরীক্ষায় অভিজ্ঞ।

দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেন, যেসব বিশেষায়িত ও কারিগরি ক্ষেত্রে নেপালের নিজস্ব দক্ষতা নেই, সেসব ক্ষেত্রে বিদেশি সহায়তা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সুড়ঙ্গে আটকেপড়া মানুষকে উদ্ধার, সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়া এলাকায় যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থা চালু করা, মৃতদেহ শনাক্ত করা, ডিএনএ পরীক্ষা এবং দীর্ঘ সময় মৃতদেহ সংরক্ষণের মতো কাজে নেপালের বিদেশি সহায়তা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ তাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলকে অভিযানে সহায়তা করার অনুমতি দিতে নেপাল সরকারকে অনুরোধ করেছে।

এই দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে নেপালের অন্তত ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন দেশটির অর্থমন্ত্রী স্বর্নিম ওয়াগলে। এই অর্থ দেশটির মোট অর্থনীতির প্রায় ১০ ভাগের ১ ভাগের সমান। গতকাল শনিবার বন্যাপরবর্তী পুনর্গঠনের কথা বলতে গিয়ে তিনি রয়টার্সকে বলেন, এটি একেবারেই প্রাথমিক একটি ধারণা। ক্ষতি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি মূল্যায়নের কাজ এখনো চলছে। তবে ২০১৫ সালে ভূমিকম্পের পর যত অর্থ প্রয়োজন হয়েছিল, এবার তার চেয়ে কম অর্থ লাগবে বলে জানান মন্ত্রী। বন্যায় সীমান্তবর্তী এলাকার বিভিন্ন শহর ও জনপদ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে গেছে অনেক সেতু ও সড়ক। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রও। রয়টার্স জানিয়েছে, প্রবাসী আয় ও পর্যটনের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল নেপালের অর্থনীতি। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১২ শতাংশের বেশি। ফলে অবকাঠামো পুনর্গঠনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থার ক্ষতিও নেপালের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

সংবাদ সংগ্রহে নতুন নিয়ম : ভোতেকোশি নদীর ভয়াবহ বন্যার সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য নতুন কিছু নিয়ম চালু করেছে দেশটির সরকার। নতুন নির্দেশনানুযায়ী, এখন থেকে বিদেশি সাংবাদিকদের পাসপোর্ট ও বৈধ ভিসার কপির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপত্র বা চুক্তিপত্র জমা দিতে হবে। শনিবার নেপালের তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন তথ্য প্রশাসন বিভাগ ও প্রেস শাখার নির্দেশনার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে কাঠমান্ডু পোস্ট। একই সঙ্গে নিজ প্রতিষ্ঠানের সুপারিশপত্র এবং সংশ্লিষ্ট দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অথবা নেপালে অবস্থিত দূতাবাস বা কনস্যুলার অফিসের সুপারিশপত্রও দিতে হবে। গত বুধবার ভোরে ভোটকোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনেক প্রতিনিধি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পৌঁছেছেন। এ পরিস্থিতিতে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশনা সুশৃঙ্খল রাখতেই বর্তমান নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছে বলে সরকারি একটি সূত্র জানিয়েছে।

বিদেশি সাংবাদিকদের নিজ প্রতিষ্ঠানের দেওয়া পরিচয়পত্র এবং বেতন ও ভাতার বিস্তারিত বিবরণও জমা দিতে হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর অনলাইনে আবেদন করতে হবে। আবেদন অনুমোদিত হলে দুই কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি নিয়ে সশরীরে তথ্য বিভাগে গিয়ে প্রেস প্রতিনিধি সনদ ও সাংবাদিক পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে হবে।

তথ্য বিভাগের মুখপাত্র গোবিন্দ প্রসাদ পান্ডে জানান, বিদেশি সাংবাদিকদের যাতে সংবাদ সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করতে না হয় বা কোনো ধরনের অসুবিধায় পড়তে না হয়, সে জন্য সরকারি ছুটির দিনেও তথ্য বিভাগের কার্যালয় খোলা থাকবে। নেপালি সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও প্রেস প্রতিনিধি সনদ বা সাংবাদিক পরিচয়পত্রের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে হবে। তাদের নাগরিকত্ব সনদের কপি, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপত্র ও সুপারিশপত্রসহ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নবায়ন বা হালনাগাদের সনদ, অঙ্গীকারনামা এবং নিয়মিত বেতন-ভাতা পাওয়ার প্রমাণ হিসেবে ব্যাংক বিবরণী জমা দিতে হবে। পান্ডে বলেছেন, এটি কোনো নতুন নীতি নয়। প্রেস পাস দেওয়ার ক্ষেত্রে তথ্য বিভাগের দীর্ঘদিনের নিয়মিত প্রক্রিয়াই বর্তমানে অনুসরণ করা হচ্ছে। ছাপাখানা ও সম্প্রচারসংক্রান্ত বিধি ও কার্যপ্রণালির আওতায় নেপালে কাজ করা বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য এ ব্যবস্থা আগে থেকেই চালু রয়েছে।