রংপুরে চার খুনের তদন্ত নিয়ে ১৯ প্রশ্ন নাগরিক কমিটির

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্য হত্যা মামলায় পুলিশের তদন্ত নিয়ে ১৯টি প্রশ্ন উত্থাপন করেছে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি। অন্যদিকে আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াই না করার ঘোষণা দিয়েছে জেলা আইনজীবী সমিতি। মামলার অন্যতম আসামি সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস ও বড় ভাই পার্থকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল হেফাজতে নিয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মুচলেকা রেখে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

এদিকে গণপতিসহ পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় মহানগরীর জাহাজ কোম্পানি মোড়সংলগ্ন একটি কমিউনিটি সেন্টারে গতকাল দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি। লিখিত বক্তব্যে সংগঠনের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন, ‘শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের সবাইকে নৃশংসভাবে খুনের ঘটনা প্রমাণ করে রংপুরসহ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটা নাজুক। এ ঘটনায় দুই কিশোরকে আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করে পুলিশ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছে তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন, সংশয় এবং আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। নাগরিক কমিটি মনে করছে, হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে পুলিশের বয়ান, নিহতদের স্বজনের জবানবন্দি, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা, পুলিশ ও ফরেনসিক কর্মকর্তার বক্তব্য অনেকটা সাংঘর্ষিক।’

বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের বেপরোয়া করে তুলছে অভিযোগ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চায়। ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার কারণে একটি পরিবারের চার জনকে হত্যা করার ঘটনা কতটা স্বাভাবিক, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। হত্যার পর আসামিরা দীর্ঘ সময় বাড়িতে অবস্থান করে গোসল ও খাবার খেয়েছেপুলিশের এই বর্ণনাও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ও গণপতি চক্রবর্তীর বাসার বিদ্যুৎসংযোগের তার কে বা কারা কেটেছে, হত্যার আগে ও পরে অচেনা মোটরসাইকেলে আনাগোনা কারা করেছিল, বাড়ির সামনের গেটে কে তালা মেরেছে এবং কেউ বাড়িটি পর্যবেক্ষণ করছিল কি না, এসব বিষয় যথাযথভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।’

তা ছাড়া লুট হওয়া টাকা ও স্বর্ণালংকারের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, পুলিশের বক্তব্যে লুট হওয়া টাকার পরিমাণ এবং আসামিদের ভাগে পাওয়া অর্থের হিসাবে অসংগতি রয়েছে। একই সঙ্গে ইয়াবার সংখ্যার হিসাব কেন পরিবর্তিত হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার আগে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের সদস্যদের কোনো আশঙ্কা বা অভিযোগ ছিল কি না, বাড়ি নির্মাণ নিয়ে তাদের হুমকি দেওয়া হয়েছিল কি না এসব প্রশ্নের উত্তরও জানতে চেয়েছে নাগরিক কমিটি। সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক কমিটির নেতারা গণপতি চক্রবর্তীসহ চার খুনের বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার, বিজয় প্রসাদ তপু, বীথি দাস নন্দিনী, মাহফুজ হোসেন, মসিউর রহমান, সবুজ রায়, মেহেদী হাসান তরুণ প্রমুখ।

অন্যদিকে মামলার আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াই না করার ঘোষণা দিয়েছে রংপুর আইনজীবী সমিতি। জেলা আইনজীবী সমিতি ভবনে সকালে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক আফতাব উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আইনজীবী সমিতির সদস্যদের আলোচনা সাপেক্ষে একই পরিবারের চার সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াই না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষে রয়েছি এবং তাদের সব ধরনের আইনি লড়াইয়ে আমরা পাশে আছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চারজনের লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ দুইজনকে আটক করেছে এবং তাদের দেওয়া তথ্য মতে লুণ্ঠিত গহনা উদ্ধার হয়েছে। আটক দুইজন ইতিমধ্যে ১৬৪ ধারায় আদালতে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশি তৎপরতা, সাংবাদিকদের সহযোগিতায় এখন পর্যন্ত পুলিশের তদন্ত এবং কার্যক্রম সঠিক পথেই আছে বলে আমরা মনে করছি।’

এ সময় রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী ডন, রংপুর আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাহেদ কামাল ইবনে খতিব, জামায়াতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কাওছার আলীসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে রংপুর মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী বিকেলে সাংবাদিকদের জানান, চার খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সিদ্ধার্থ দাসের বাবা ও ভাইকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আসামিদের বাড়ি ও নিহত পরিবারের বাড়ির অবস্থান একই জায়গায়। সার্বিক বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আসামি সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ও বড় ভাই পার্থ দাসকে নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ রাত ১১টার দিকে সনাতন চক্রবর্তী জানান, ‘ডিবি কার্যালয়ে প্রায় ছয় ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর মুচলেকা রেখে রাত সাড়ে ১০টার দিকে বিনয় দাস ও পার্থ দাসকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের বিক্ষোভ : রংপুরে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে সপরিবারে হত্যার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ। এ ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে সংসদে বিবৃতি দেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে। ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে দুপুরে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল শেষে আয়োজিত সমাবেশে সংগঠনটির নেতারা এসব দাবি জানান।

নেতারা অভিযোগ করেন, একটি বিশেষ চক্র নিজেদের উদ্দেশ্য ও স্বার্থ চরিতার্থ করতে রংপুরের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল বা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পুলিশি তৎপরতা শুরু হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের বয়ান বিশ্বাসযোগ্য নয় বলেও তারা অভিযোগ করেন।

সমাবেশের আগে একটি বিক্ষোভ মিছিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের আশপাশের সড়ক প্রদক্ষিণ করে। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি নির্মল রোজারিও। যুব ঐক্য পরিষদের সভাপতি শিমুল সাহার পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন কাজল দেবনাথ, ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়, মিলন কান্তি দত্ত, ডিএন চ্যাটার্জি, সাংবাদিক বাসুদেব ধর, মনীন্দ্র কুমার নাথ, জয়ন্তী রায়, পদ্মাবতী দেবী, অ্যাডভোকেট অপূর্ব ভট্টাচার্য, সাংবাদিক পুলক ঘটক, অতুল মণ্ডল, দিপালী চক্রবর্তী, তাপস দাস ও দিপংকর চন্দ্র শীলসহ অন্য নেতারা।

রংপুরের নিজ বাড়ি থেকে গত ২২ আগস্ট রাতে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এ মামলায় পুলিশ স্থানীয় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করেছে। আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর থেকে তারা কারাগারে আছেন।