গুমের বিচার কতদূর

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাধারণ নাগরিক থেকে রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গুমের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ফিরে এসেছেন। আবার অনেকেই বছরের পর বছর আয়নাঘরে বন্দি ছিলেন, আবার চিরতরে হারিয়ে গেছেন। বিশেষ করে বিএনপির অনেক নেতা গুমের শিকার হয়েছেন। গুম ও নিখোঁজের বিষয়ে থানা ও আদালতে ফৌজদারি মামলা-জিডি করা হলেও থমকে আছে তদন্ত। জানা গেছে, একটি মামলারও তদন্ত শেষ হয়নি। এক্ষেত্রে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’ ইতিমধ্যে মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেও এটি এখনো আইনে পরিণত হয়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন আইনটি হলে মামলার তদন্তে গতি আসতে পারে। 

ইতিমধ্যে গুমের ঘটনার দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিশেষ নির্দেশনা এসেছে পুলিশের সবকটি ইউনিট প্রধানদের কাছে। গুমের নায়করা অধরা থাকায় ভুক্তভোগীরা ক্ষোভও জানিয়েছেন। কমিশন গঠন করেও হচ্ছে না কোনো কাজ। তবে পুলিশের শীর্ষ কর্তারা বলেছেন, পলাতক রাঘববোয়ালদের ধরতে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে গুমের অভিযোগে ফৌজদারি মামলায় গতি না থাকলেও গুমের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি মামলা সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আগামী মাসে এ মামলাগুলো রায়ের পর্যায়ে আসতে পারে। আর পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গুমের অভিযোগ নিয়ে আড়াইশর মতো মামলা-জিডি তদন্তের পর্যায়ে আছে।

গুমের ফৌজদারি মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কয়েকজন দেশ রূপান্তরকে জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের তথ্য অনুসন্ধানে গঠিত বিশেষ তদন্ত কমিশন এই পর্যন্ত এক হাজার ৮৫০টির অভিযোগ পেয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানে ১৫শটি ঘটনার সত্যতা মিলেছে, যার মধ্যে বিশাল একটি অংশের খোঁজ এখনো মেলেনি। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর আগের ও পরের সময়গুলোতে গুমের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাক ও পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’-এ বছরের পর বছর আটকে রাখা হতো ভুক্তভোগীদের।

পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (অপারেশন) মো. রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অপহরণ, নিখোঁজের মামলা বা জিডির অভিযোগগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ 

মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকারের’ তথ্য বলছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ৭০৮ জন নিখোঁজ হয়েছেন। তবে অপর মানবাধিকার সংগঠন আসক-এর তথ্য বলেছে, ২০০৭ সাল থেকে ২০২৩ সালে গুমের শিকার হয়েছেন ৬২৯ জন। তার মধ্যে ২০১৬ সালে সবচেয়ে বেশি ৯৭ জন গুম হন।

পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মদদে অপরাধী ছাড়াও নিরীহদের গোপন স্থানে ধরে নিয়ে আটকে রাখা হয়। তাদের মধ্যে অনেকের লাশ পাওয়া যায় মাঝে মধ্যে। এসব গুম বা নিখোঁজ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী বনানী এলাকা থেকে নিখোঁজ হন। ২০১০ সালের ২৫ জুন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগরের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর চৌধুরী আলম নিখোঁজ হন, তারা আর ফিরে আসেননি। ফিরে আসেননি তেজগাঁওয়ের ২৫ নম্বর ওয়ার্ড (সাবেক ৩৮) বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনও। গুমের ঘটনা তদন্তে গঠিত গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের সঙ্গে নিজেদের সংশ্লিষ্টতা লুকাতে একটি গোয়েন্দা সংস্থা গত ৫ আগস্টের পর ‘আয়নাঘরের’ প্রমাণাদি নষ্ট করে ফেলেছে।

আইনে অসংগতি বলছেন মানবাধিকারকর্মীরা : গত ৩ আগস্ট ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এটি এখন জাতীয় সংসদে বিল আকারে তোলা হবে এবং সেখানে পাস হলে তা আইনে পরিণত হবে। খসড়া আইনে গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। যদিও খসড়া আইনে উদ্বেগ জানিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকরা বলছেন, গুমের অভিযোগে পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকরাই অভিযুক্ত হন। সেক্ষেত্রে গুমের অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

মানবাধিকারকর্মী ও গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সাবেক সদস্য নূর খান লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফৌজদারি মামলাগুলোর কোনো অগ্রগতি নেই, এটি হতাশাজনক। যে বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ থাকবে, সেই বাহিনীর বিষয়ে অন্য বাহিনী বা আন্তঃবাহিনীর তদন্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য হবে না এবং তদন্তে সন্দেহ থেকেই যাবে। গুমের অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত কমিশন থাকতে পারে কিংবা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অধীনে কোনো বাহিনী তদন্ত করতে পারে।’

ট্রাইব্যুনালে তিন মামলায় গতি : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গুমের তিনটি মামলায় অগ্রগতি হয়েছে। এর মধ্যে র‌্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম করে নির্যাতনের অভিযোগের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ক্যান্টনমেন্টে সাবজেলে থাকা ১০ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে বিচার রয়েছে সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে। গত ১২ জানুয়ারি এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ায় এ মামলায় সাতজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। র‌্যাবের ওই সেলে ১৪ জনকে গুম করে নির্যাতনের ঘটনায় ১৭ আসামির বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের শাসনামলে ডিজিএফআইর জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) গুম করে নির্যাতনের ঘটনায় শেখ হাসিনা ও ১১ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৩ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় গত ১৯ জানুয়ারি। এ মামলায় এখন পর্যন্ত সাতজনে সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার সাবেক সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ১০ আসামি পলাতক রয়েছেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। ইতিমধ্যে এ মামলায় আসামির বিরুদ্ধে ৯ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এই মামলায় জিয়াউল আহসান একমাত্র আসামি। আইনের বিধান অনুযায়ী, আসামিদের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য শেষে উভয়পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্কের শুনানি হবে। এরপরই এ তিন মামলা রায়ের পর্যায়ে আসবে।

বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে গুমের মামলায় বিমান বাহিনীর সাবেক উইং কমান্ডার সাইফুর রহমান সাইফকে গত ২৩ আগস্ট গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। এ মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে আসামি করে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মামলাটি তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালককে তুলে নেওয়ার সময় সাইফুর রহমান র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত ছিলেন। জিয়াউল আহসানও তখন র‌্যাবে কর্মরত ছিলেন।

এ ছাড়া ২০১৫ সালের মার্চে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সালাউদ্দিন আহমদকে গুমের মামলায় গত ২৭ আগস্ট সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। এ মামলাটি তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। সালাউদ্দিন আহমদকে গুমের মামলায় শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ ও একেএম শহিদুল হকসহ ৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। 

ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্তত ১০টি গুমের মামলা ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত করছে। যে মামলাগুলো সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে আছে, সেগুলো আগামী মাসের মধ্যে রায়ের পর্যায়ে আসতে পারে। এক প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, গুমের স্বতন্ত্র অভিযোগ এলে তা নিম্ন আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’ টিএফআই সেলে গুম করে নির্যাতনের অভিযোগের মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী তাবারক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আশা করি আসামিরা ন্যায়বিচার পাবেন।’

আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস : আজ ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধে পৃথক আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে তিনি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব গুম হওয়া ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সহানুভূতি জানিয়ে বলেন, পলাতক ফ্যাসিস্ট সরকার দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার দমনের জন্য গুম-অপহরণের অমানবিক পথ বেছে নিয়েছিল। এই মনুষ্যত্বহীন অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিচারের জন্য দুনিয়াজুড়ে ঐক্য ও সংহতির আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

দিবসটি উপলক্ষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে গুম রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও ভিন্নমত স্তব্ধ করার এক ভয়াবহ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, মানবাধিকারকর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীসহ বহু মানুষ এর শিকার হয়েছেন। অনেক পরিবার আজও জানে না তাদের প্রিয়জন কোথায় কিংবা আদৌ ফিরে আসবেন কি না। তাদের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা জাতীয় বিবেকের সামনে এক গভীর দায় হয়ে আছে। একই সঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সত্য জানা, ন্যায়বিচার পাওয়া, ক্ষতিপূরণ ও যথাযথ পুনর্বাসনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে দিবসটি উপলক্ষে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন মায়ের ডাকসহ বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। আসক ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি পৃথক বিবৃতিতে বিভিন্ন দাবি জানিয়েছে।

‘গুম’ নিয়ে এমন আইন আসবে ভিকটিম বিচার পাবে : বিএনপি সরকার ‘গুম’ নিয়ে এমন আইন আনতে চায় যাতে প্রতিটি ভিকটিম বিচার পাবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, কোন ধরনের গুমে কী সাজা, সেগুলো অ্যাড্রেস করেছি। তদন্ত কারা করবে, কীভাবে করবে, সেগুলো ঠিক করেছি। গুমের শিকার কাউকে পাওয়া না গেলে তার ওয়ারিশরা যেন তার সম্পদ পান, সে বিধান করেছি। যারা গুম করেছে তারা যদি শেষ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিতে নাও পারে, তবুও রাষ্ট্র যেন সেটা দিতে পারে, সেই বিধান করেছি। এই আইনে কিছু ত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করা যাবে। আমি নিজেও গুমের শিকার। আমি কি চাইব না যে গুম নিয়ে একটি শক্তিশালী আইন হোক? আমরা আজ সরকারে আছি, আগামীতে নাও থাকতে পারি। কিন্তু এই আইনটা থাকবে। ফলে গুমের শিকার যিনিই হন, তিনি বিচার পাবেন।