ঢাকায় চিকিৎসা নিতে আসেন শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন (৪৫)। ব্যবসায়ী স্বামী আব্দুল মতিনের সঙ্গে রিকশায় গন্তব্যে যাচ্ছিলেন। কিন্তু জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ৩০-৩৫ সেকেন্ডের একটি ঘটনায় মুহূর্তেই বদলে গেল দৃশ্যপট। মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী পারভীনের হাতব্যাগ ধরে টান দেয়। এতে চলন্ত অটোরিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শিক্ষিকা পারভীন ঢাকায় এসেছিলেন বাঁচার জন্য, চিকিৎসার জন্য। অথচ ফিরলেন লাশ হয়ে।
গতকাল শনিবার ভোর ৬টার দিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সংসদ ভবনের সামনের সড়কে এই ঘটনা ঘটে। যে মানুষটি প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের স্বপ্ন দেখাতেন, ন্যায়ের কথা বলতেন, বলতেন জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা, সেই মানুষটিই রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে ছিনতাইকারীদের কবলে প্রাণ হারালেন।
নিহত রনজিলা পারভীন বগুড়ার গাবতলীর বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তার বাড়ি উপজেলার সোনাকানিয়া গ্রামে। তিনি বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকায় স্বামী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে বসবাস করতেন। মেয়ে রাইসা বগুড়ার ইয়াকুবিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। রাইসা বলেন, গতকাল বিকেলেই মা নাশতা বানিয়ে দিয়েছেন। রাতের খাবার একসঙ্গে খেয়েছি। মা বাবার সঙ্গে ঢাকায় গেছেন। এ ঘটনা মিথ্যা মা ঠিক আছে, বলেই সংজ্ঞাহীন হয়ে যায় রাইসা। প্রতিবেশী ও স্বজনরা বলছেন, মায়ের শোকে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছে রাইসা। তাকে বাঁচানোই এখন দায়। ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের স্বজন হারানোর কষ্ট নয়; একটি স্কুলের শত শত শিক্ষার্থীর কাছে প্রিয় একজন শিক্ষকের আকস্মিক হারিয়ে যাওয়া। সহকর্মীদের কাছে একজন দায়িত্বশীল সহযোদ্ধাকে হারানোর বেদনা। প্রতিবেশীদের কাছে পরিচিত, আপন একজন মানুষের আর কখনো ফিরে না আসার শোক। সুস্থ-সবল একজন মানুষ সহপাঠীদের কাছ থেকে দোয়া নিয়ে চিকিৎসা নিতে ঢাকায় আসেন। পথেই বেপরোয়া ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারালেন। শিক্ষিকা পারভীন ঢাকায় এসেছিলেন বাঁচার জন্য, চিকিৎসার জন্য। অথচ রাজধানীর সড়কেই তার জীবন থেমে গেল। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরবেন। আবার স্কুলে যাবেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলবেন। সেই সব স্বাভাবিক প্রত্যাশা এখন শুধুই স্মৃতি।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চোখের ডাক্তার দেখাতে গত শুক্রবার রাতে বগুড়া থেকে স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় আসেন শিক্ষিকা পারভীন। ভোরে রাজধানীর কল্যাণপুরে বাস থেকে নামেন তারা। ভোর হয়ে যাওয়ায় ডাক্তারের সিরিয়াল দিতে অটোরিকশায় হাসপাতালের দিকেই আসছিলেন তারা। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে আসতেই একটি চলন্ত মোটরসাইকেলে দুই ছিনতাইকারী অটোরিকশার পেছন থেকে শিক্ষিকার হাতে থাকা ব্যাগ ধরে টান দেয়। তবে ছিনতাইকারীদের লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। চিৎকার করলে তারা একটু পিছিয়ে যায়। পরে তারা রিকশার কাছে চলে আসে, এবার কিছু বুঝে ওঠার আগেই ব্যাগ ধরে টান দিলে শিক্ষিকা রিকশা থেকে নিচে পড়ে যান। এতে সড়কে ছিটকে পড়ে মাথার পেছনটা ফেটে যায়। তাকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ডিএমপির শেরই বাংলা নগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম বলেন, ওই ঘটনায় শেরে বাংলা নগর থানায় ছিনতাই ও হত্যার অভিযোগে মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। লাশ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নিহতের বড় ভাই জাহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, রবিবার (আজ) বাদ জোহর গাবতলীর দাড়াইল তরফসরতাজ গ্রামে তার শশুরবাড়িতে নিহতের দাফন সম্পন্ন হবে।
সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেছে : সংসদ ভবনের সামনের সড়কে গাড়ি চলাচল করছে। তার মধ্যে একটি সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেলে দুই যুবক। তারা ফার্মগেটের দিকে আসছে। তাদের সামনের অটোরিকশার দুই যাত্রী তাদের টার্গেট। মোটরসাইকেলে থাকা দুই যুবকের মধ্যে চালকের গায়ে সাদা গেঞ্জি ও সাদা প্যান্ট, মাথায় কালো রঙের হেলমেট। আর পেছনে বসে থাকা তার সহযোগীর গায়েও গেঞ্জি ও প্যান্ট। তবে মাথায় কোনো হেলমেট নেই।
এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে করে আসা ছিনতাইকারীরা তার হাতব্যাগ টান দেয়। আকস্মিক টানে ভারসাম্য হারিয়ে রিকশা থেকে পড়ে যান তিনি। মাথায় গুরুতর আঘাত পান। হাসপাতালে নিলে তিনি মারা যান।
‘ম্যাডাম আর স্কুলে আসবেন না’ : প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তার কর্মস্থলে নেমে আসে শোকের ছায়া। যে শ্রেণিকক্ষগুলোতে তার কণ্ঠে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের কথা শোনা যেত, সেখানে এখন কেবল শূন্যতা। সহকর্মীদের কাছে শুধু একজন প্রধান শিক্ষিকা নন, বরং প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকের মতো ছিলেন। তার এমন আকস্মিক মৃত্যু সহকর্মীরা বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে মানুষটি চিকিৎসা শেষে আবার ফিরে আসার কথা, তিনি আর কখনো স্কুলে ফিরবেন না। শিক্ষার্থীদের কাছেও এই মৃত্যু আরও বেশি বেদনাদায়ক। তার কণ্ঠে শাসন ছিল, আবার সেই শাসনের আড়ালেই ছিল মমতা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহত পারভীনের সহকর্মী মেরিনা খাতুন বলেন, দুষ্টু শিক্ষার্থীদের আদর করে পড়াতেন পারভীন। তিনি বলতেন, দুষ্টুদের শাস্তি দিয়ে নয়, বরং ভালোবাসা ও আদর দিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগী করা যায়। কখনো দেরি করে বিদ্যালয়ে আসতেন না। আমরা তাকে অনুসরণ করতাম। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বাইরে খেলাধুলা, নাচ-গান, স্বেচ্ছাসেবী কাজে আগ্রহ তৈরি করতেন। তার অকাল মৃত্যুতে আমরা অভিভাবকশূন্য হয়ে গেলাম।। রনজিলা ম্যাডাম মারা গেছেন এমন কথা বিশ্বাস করতে নারাজ ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জায়ান ও শিফা। তারা বলে, বৃহস্পতিবার ম্যাম সৌরজগত নিয়ে অনেক কিছু বলেছে। রবিবার আরও অনেক কিছু বলতে চেয়েছেন তিনি।
রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন : ঘটনাটি আবারও রাজধানীর সড়কে পথচারী ও যাত্রীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এনেছে। ঢাকার ব্যস্ত সড়কে মোটরসাইকেলে ছিনতাই নতুন কোনো ঘটনা নয়। কখনো পথচারীর মোবাইল, কখনো ব্যাগ, কখনো গলার চেন ধরে টান দেয় ছিনতাইকারীরা। এতে ভুক্তভোগীর প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটছে। রনজিনা পারভীনের মৃত্যু সেই বাস্তবতাকেই আরও নির্মমভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।