বানরের অবাক জলপান

৮ মার্চ ২০২০ সাল অর্থাৎ এ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার দিন সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের রওনা দিয়েছিলাম। ওখানে দু-দিন থেকে তৃতীয় দিন এলাম হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। চতুর্থ দিন ঢাকায় ফিরে আসার আগে দুপুরে সাতছড়ির প্রধান সড়কের পাশে বৃক্ষঘেরা জনমানবহীন বিশাল এক পুকুরের পাড়ে স্ট্যান্ডে ক্যামেরা সেট করে চুপচাপ বসে আছি। দুপুরের খরতাপে তৃষ্ণা মেটাতে এক এক করে বুলবুলি, ঘুঘু ও বানর এসে আকণ্ঠ পানি পান করে তৃষ্ণা মিটিয়ে চলে গেল। খানিক পর আসতে থাকল বানরের দল। ওদের ভয়ে পাখিরা পানিতে নামা বন্ধ করে দিল। বানরের সর্বশেষ দলটি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর বাচ্চাসহ বিচিত্র এক প্রজাতির বানর পুকুর পাড়ে এলো। এই প্রজাতির বানরের লেজ খাটো, দেখতে অনেকটাই শূকরের লেজের মতো। চেহারা বেশ গম্ভীর। একটি পুরুষ বানর যেভাবে পুকুর পাড়ের একটি গাছ ধরে দাঁড়াল, দেখে মনে হলো যেন কোনো বয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। বয়স্ক, স্ত্রী, পুরুষ ও বাচ্চা নির্বিশেষে একে একে পুকুর পাড়ে বসে পানি পান করে তৃষ্ণা মিটিয়ে ওরা চলে গেল। আর আমরাও ওদের বেশকিছু সুন্দর ছবি তুলে ঢাকার পথে পা বাড়ালাম।

ঠিক এক বছর পর একই দিনে অর্থাৎ ১১ মার্চ ২০২১-এ সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে এলাম। আবারও বড় পুকুরে বসলাম পাখি-প্রাণীর ছবি তোলার জন্য। বেলা যখন ৩টা ২৭ মিনিট, তখন সেই শূকর-লেজের বানরের দল এসে হাজির। কিন্তু গত বছরের মতো এবার ওরা পুকুর পাড়ের মাটিতে বসে পানি পান করল না। বরং অভিনব কায়দার গাছের সরু ডাল থেকে ঝুলে ঝুলে পানি পান করতে লাগল। একটি বানর ছানাকে তো দেখলাম তার মা গাছে ঝুলে পানি পানের সময় সে তার মায়ে ওপর বসে আছে। এ রকম দৃশ্য যেমন আগে কখনো দেখিনি তেমনি এই অভিনব কায়দায় বানরের পানি পান করাও দেখিনি। তাই বিশেষ এই দৃশ্যগুলো ক্যামেরার ক্যানভাসে ধরে রাখতে একটুও দেরি করিনি।

অভিনব কায়দায় পানি পান করা এই বানর আর কেউ নয়, এদেশের এক দুর্লভ স্তন্যপায়ী প্রাণী উল্টোলেজি বানর। কুলু বান্দর, উলু বান্দর, সিংহ বানর, ছোটলেজি বানর বা শূকরলেজি বানর নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Northern Pig-tailed Macaque, Pig-tailed Macaque, Burmese Pig-tailed Macaque  বা Long-haired Pig-tailed Macaque। সারকোপিথেসিডি গোত্রভুক্ত প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম Macaca leonine| । বর্তমানে এদেশে এরা বিপন্ন ও পুরো বিশ্বে সংকটাপন্ন বলে বিবেচিত। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, লাওস, কম্বোডিয়া, চীন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে দেখা যায়।

উল্টোলেজি বানরের নাকের আগা থেকে লেজের গোড়া পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ৪০-৬০ সেন্টিমিটার ও লেজ ১৮-২৫ সেন্টিমিটার। ওজন ৪.৫-১২.০ কেজি। শূকরের মতো ছোট লেজটি ওপরের দিকে উল্টানো। দেহের ওপরের লোম জলপাই-ধূসর, নিচটা ধূসর-সাদা ও মুখম-ল গোলাপি। মাথার মাঝখানটা চ্যাপটা ও সেখানকার লোম কালচে। দলনেতার মাথায় কখনো কখনো সিংহের মতো কেশর দেখা যায়।

এরা সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনে বাস করে। সিলেটের লাউয়াছড়া, আদমপুর ও সাতছড়িতে এদের বেশ দেখেছি। এরা দিবাচর, বৃক্ষবাসী ও ভূমিচারী। শক্তসমর্থ পুরুষের নেতৃত্বে স্ত্রী, পুরুষ ও বাচ্চা মিলে পাঁচ-২৫টির দলে বসবাস করে। পুরুষ বেশ রাগী; কাউকে ভয় দেখানোর জন্য দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে ভেংচি কাটে। নিজেদের মধ্যে বেশ মারামারি করে। স্ত্রী তুলনামূলকভাবে শান্ত। ফল, মূল, কচি পাতা, কুঁড়ি, কীটপতঙ্গ, কাঁকড়া, পাখির ছানা ইত্যাদি খায়। খাদ্যাভাবে কখনো কখনো শস্যক্ষেতেও হানা দেয়। এদের গলার স্বর কর্কশ, কাশির মতো ‘খক-খক-খক-খক’ আওয়াজ করে।

উল্টোলেজি বানর সারা বছরই প্রজনন করতে পারে; তবে মার্চ-জুনেই বেশি করে। স্ত্রী ১৬২-১৮৬ দিন গর্ভধারণের পর সচরাচর একটি বাচ্চার জন্ম দেয়। বাচ্চারা এক বছর বয়সে দুধ ছাড়ে এবং তিন থেকে চার বছরে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়। আয়ুষ্কাল ১০-১২ বছর। আবাস এলাকা ধ্বংসের কারণে দিনে দিনে এদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। কাজেই সময় থাকতেই উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বিপণœ এই বানরগুলো অচিরেই এদেশ থেকে হারিয়ে যাবে।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ