মানবপাচার ও অবৈধ অভিবাসনের শিকার বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া দ্রুত ও সমন্বিত করতে চালু হয়েছে কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম রিপ্যাট্রিয়েশন ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আরডিএমএস)। জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজের সঙ্গে ইতোমধ্যে যুক্ত হয়েছে সিস্টেমটি।
মানবপাচার ও অবৈধ অভিবাসনের শিকার বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশ থেকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া আরও কার্যকর ও সমন্বিত করতে রিপ্যাট্রিয়েশন ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম আরডিএমএস চালু করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
রবিবার (৩০ আগস্ট) সকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বোর্ডরুমে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সিস্টেমটির উদ্বোধন করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক ও বহিরাগমন) ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়। এতে সহযোগিতা করে জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার, বাংলাদেশ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্পেশাল ব্রাঞ্চ বাংলাদেশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি সরদার নুরুল আমিন, স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডিআইজি, এসসিও জাহাঙ্গীর হোসেন এবং অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের কাউন্সেলর রুবেন গ্রে। স্বাগত বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-১ অধিশাখার যুগ্মসচিব রেবেকা খান। আরডিএমএস-এর উদ্দেশ্য ও সুবিধা তুলে ধরেন জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার, বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর তারিকুল ইসলাম।
সভাপতির বক্তব্যে ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ মানব পাচার প্রতিরোধ এবং উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পুনরেকত্রীকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডোমেইনে রেফারাল ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত করার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিনি জানান, দেশে ফেরত আসা ব্যক্তি ও সারভাইভারদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণের জন্য আরডিএমএস ইতোমধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। শিশুদের সঠিকভাবে শনাক্ত করার লক্ষ্যে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন এবং পাসপোর্ট সেবার সঙ্গে সিস্টেমটির সমন্বয়ের কাজও চলছে।
অবৈধ অভিবাসন রোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের বিশেষ শাখার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার প্রশংসা করে ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ আশা প্রকাশ করেন, আন্তঃসংস্থার এই সমন্বিত উদ্যোগ সারভাইভারদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসন বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরডিএমএস তৈরি করেছে। সিস্টেমটির উন্নয়ন ও আপগ্রেডেশনে সহায়তা করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার।
আরডিএমএস একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে মানব পাচার ও অবৈধ অভিবাসনের শিকার বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশ থেকে দেশে ফেরানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সহজ ও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
বিদেশে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় একাধিক সরকারি সংস্থা যুক্ত থাকে। এ ক্ষেত্রে জাতীয়তা যাচাই, পুলিশ রেকর্ড পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত এবং সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগসহ বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। এতদিন এসব কাজের বড় একটি অংশ কাগজপত্র ও চিঠিপত্রের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় অনেক সময় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হতো।
অনুষ্ঠানে আরডিএমএস-এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়। এতে প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত মামলার তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, জাতীয়তা ও পুলিশ রেকর্ড যাচাই দ্রুত সম্পন্ন এবং তথ্যের নির্ভুলতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাবে।
এ ছাড়া সিস্টেমটির মাধ্যমে প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত তথ্য দ্রুত পাওয়া, রিয়েল-টাইমে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিবেদন তৈরির সুযোগ থাকবে।
আরডিএমএস-এর ব্যবহার করে বিদেশে থাকা বাংলাদেশি হাইকমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আরও নির্ধারিত ও সমন্বিত পদ্ধতিতে প্রত্যাবাসনের আবেদন করতে পারবে। জাতীয়তা যাচাইয়ের সময় প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানও সহজ হবে। ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও সিস্টেমে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করছে, আরডিএমএস চালুর ফলে তথ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার হবে এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর হবে। বিদেশ থেকে দেশে ফেরা বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য আরও সমন্বিত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতেও সিস্টেমটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আরডিএমএস উন্নয়ন ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে অবদানের জন্য বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ, জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার, বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া সরকার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও হাইকমিশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি সংস্থার কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।