অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা হারে নগদ সহায়তা দিতে ফ্যামিলি কার্ড নীতিমালা জারি করেছে সরকার। বিশেষ করে নারীপ্রধান পরিবার বা পরিবারের বয়োজৈষ্ঠ কিংবা দায়িত্বশীল নারীর নামে হবে এই কার্ড। দেশের ২ কোটি পরিবারকে এই আর্থিক সহায়তার অর্থ সরাসরি গভর্নমেন্ট টু পারসন (জি-২-পি) পদ্ধতিতে নিয়মিত পরিশোধ করা হবে। গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের আগে ঘোষিত এই কর্মসুচি দারিদ্র বিমোচন ও স্বয়ম্ভরতা অর্জনে বর্তমান সরকারের একটি বড় প্রতিশ্রুতি ছিল। সারাদেশে সমতলের তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম পাড়াগুলোতেও সকল জনগোষ্ঠীর জন্য এই সুবিধা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে কমিটি কাজ করবে বলে নীতিমালায় বলা হয়েছে।
গত শনিবার (২৯ আগস্ট) সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড করা ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা ২০২৬-এ ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে ৮ ধরনের ব্যক্তি বা পরিবারকে এ কর্মসুচির বাইরে রাখা হয়েছে।
এ নীতিমালার মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি এবার বড় পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য পূর্ণাঙ্গ কাঠামো তৈরি হলো। এর আগে ৩ লাখ ২০ হাজার পরিবারকে পাইলট পর্যায়ে ফ্যামিলি কার্ড দেয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছিল। নির্বাচিত এলাকা ছিল রাজধানীর কড়াইল বস্তি ও মিরপুরে অবস্থিত অলিমিয়ারটেক ও বাগানবাড়ী বস্তি, পাংশা (রাজবাড়ী), পতেঙ্গা (চট্টগ্রাম), বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), লামা (বান্দরবান), খালিশপুর (খুলনা), চরফ্যাশন (ভোলা), দিরাই (সুনামগঞ্জ), ভৈরব (কিশোরগঞ্জ), বগুড়া সদর, লালপুর (নাটোর), ঠাকুরগাঁও সদর এবং নবাবগঞ্জ (দিনাজপুর)।
নীতিমালায় বলা হয়, সরকারের ঘোষিত ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক ‘সামাজিক কল্যাণ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এর মূল দর্শন হলো, ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। এ দর্শনের আলোকে দেশের অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে সমন্বিত ডিজিটাল সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
এ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের প্রায় ২ কোটি দরিদ্র ও নারী পরিবার প্রধানকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাঁচ (৫) সদস্যের বেশি পরিবার সর্বোচ্চ ২টি কার্ড এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যা ১০ অতিক্রম করলে ক্ষেত্রবিশেষে ৩টি কার্ড বিতরণের কথা নীতিমালায় বলা হয়েছে। নীতিমালায় ফ্যামিলি কার্ড-এর ডিজিটাল সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
আট (৮) শ্রেণির মানুষ পাবেন না ফ্যামিলি কার্ড
নীতিমালায় ফ্যামিলি কার্ডের নগদ সহায়তা প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে একটি ‘নেগেটিভ লিস্ট’ বা বহির্ভূত তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্যের কোনো একটি থাকলে ব্যক্তি বা পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।
এক. সরকার নির্ধারিত পিএমটি স্কোরের ঊর্ধ্বসীমার চেয়ে বেশি স্কোর পাওয়া পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পাবে না। দুই. পরিবারের মনোনীত নারী প্রধান সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পেলে তিনি সুবিধার বাইরে থাকবেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষক বা কর্মচারী হলেও ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া যাবে না। তিন. পরিবারের মনোনীত নারী প্রধান নিয়মিত সরকারি পেনশন বা অনুরূপ অবসর সুবিধা গ্রহণ করলে ফ্যামিলি কার্ড পাবেন না। তবে প্রতিবন্ধী সন্তান হিসেবে বিশেষ পেনশন সুবিধা গ্রহণকারী এ শর্তের বাইরে থাকবেন। চার. পরিবারের কোনো সদস্যের নামে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে ৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকলে সুবিধা মিলবে না। একইভাবে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়, ফিক্সড ডিপোজিট বা অন্য কোনো বিনিয়োগ থাকলেও পরিবারটি বাদ পড়বে। পাঁচ. পরিবারের কোনো সদস্যের নামে বিআরটিএ নিবন্ধিত তিন বা চার চাকার মোটরযান থাকলে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে না। এর মধ্যে সিএনজি বা পেট্রোলচালিত ফোর-স্ট্রোক থ্রি-হুইলার, কার, জিপ, পিকআপ, বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লরি ও মাইক্রোবাস রয়েছে। ছয়. পরিবারের কোনো সদস্যের নামে বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হালনাগাদ লাইসেন্স বা ব্যবসা থাকলে তিনি এ কর্মসূচির সুবিধা পাবেন না। সাত. পরিবারের কোনো সদস্য নিয়মিত করদাতা হলে এবং তার করযোগ্য আয় থাকলে পরিবারটি ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধার জন্য যোগ্য হবে না। আট. বসতভিটাসহ পরিবারের মোট আবাদি জমির পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫০ একর বা তার বেশি হলে ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া যাবে না। এছাড়া কোনো অকৃষি বা বাণিজ্যিক জমি বা স্পেসের বাজারমূল্য ৫ লাখ টাকার বেশি হলেও পরিবারটি সুবিধার বাইরে থাকবে।
'ফ্যামিলি কার্ড' কর্মসূচির মূল দর্শন হলো- ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। এ দর্শনের আলোকে প্রতিটি লক্ষ্যভুক্ত পরিবারকে একটি 'স্বনির্ভর ইউনিট' হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এ নীতিমালার অধীন যেসব কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে ত হলো : (ক) পরিবার-কেন্দ্রিক উন্নয়ন: একক ব্যক্তি-ভিত্তিক উন্নয়ন ভাবনার পরিবর্তে সমগ্র পরিবারকে কেন্দ্র করে একটি সুসংহত ও টেকসই স্বনির্ভর ইউনিট গড়ে তোলা; (খ) নারীর ক্ষমতায়ন: পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ ও ভূমিকা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট পরিবারের মাতা অথবা উপযুক্ত জ্যেষ্ঠ নারী সদস্যের নামে 'ফ্যামিলি কার্ড' ইস্যু করা; (গ) ডিজিটাল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: 'অনন্য একক পরিচিতি' এবং সরাসরি সুবিধা হস্তান্তর (জি২পি) পদ্ধতির মাধ্যমে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ব্যতিরেকে সরাসরি প্রকৃত উপকারভোগীর নিকট রাষ্ট্রীয় সুবিধা পৌঁছানো নিশ্চিত করা; এবং (ঘ) টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা: ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য নিরসনে সরকারের জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনে কার্যকর অবদান রাখা।
নীতিমালায় বলা হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে বর্ণিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। উক্ত সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর 'ফ্যামিলি কার্ড' কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। 'ফ্যামিলি কার্ড' কর্মসূচির লক্ষ্য হলো একটি সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টির মাধ্যমে লক্ষ্যভুক্ত জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক নারীদের আর্থিক সহায়তার আওতায় আনার মাধ্যমে পরিবারসমূহকে স্বাভাবিক জীবনধারণে সহায়তা করা। সংবিধানের উল্লিখিত নির্দেশনাবলি অনুসরণে একটি সমন্বিত ডিজিটাল সেবা কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই এ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এটি একদিকে যেমন সামাজিক সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে একটি কল্যাণমুখী ও বৈষম্যহীন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিনির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় তালিকাভুক্ত প্রতিটি যোগ্য পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী ও অনন্য পরিচিতি নম্বর দেওয়া হবে। ‘ওয়ান-আইডি’ নামে এ পরিচিত এ কার্ড ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট পরিবারের কেন্দ্রীয় পরিচিতি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। নীতিমালায় বলা হয়, ওয়ান-আইডি শুধু একটি পরিচিতি নম্বর নয়। এটি রাষ্ট্রীয় তথ্য ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত ও সুসংহত ডেটা গভর্ন্যান্স কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে জাতীয় স্বার্থে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এ তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
ফ্যামিলি কার্ডধারী মনোনীত নারী পরিবার প্রধান একই সময়ে অন্য কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সমজাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অধীনে আর্থিক, খাদ্য বা অন্য কোনো সুবিধা নিতে পারবেন না। কোনো নারী প্রধান আগে থেকেই টিসিবির স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট বা ভিডব্লিউবি কর্মসূচির সুবিধা পেয়ে থাকলে তার আগের সুবিধা কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ যাচাইয়ের মাধ্যমে বাতিল বা স্থগিত করা হবে। একইভাবে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা বা সমজাতীয় সরকারি নগদ সহায়তা গ্রহণকারী নারী প্রধান ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা নেওয়ার সময় আগের সুবিধা রাখতে পারবেন না। তবে মনোনীত নারী প্রধান ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যরা প্রচলিত নিয়মে অন্যান্য সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।
ফ্যামিলি কার্ডের আবেদনকারীর তথ্যের সত্যতা ও সঠিকতা যাচাই করতে বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডেটাবেজের সঙ্গে এপিআই সংযোগ স্থাপন করা হবে।
জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বিআরটিএ, ভূমি মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগের আওতাধীন সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি এমআইএস এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের সঙ্গে এ সংযোগ করা হবে। কারিগরি প্রয়োজনে সরকার যেকোনো সময় এ তালিকার পরিধি বা এপিআই সংযোগ পুনর্বিন্যাস করতে পারবে।
এছাড়া, জালিয়াতি ধরতে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের সুযোগও রাখা হয়েছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রিতে সংরক্ষিত তথ্যে কোনো অসঙ্গতি বা জালিয়াতি প্রতিরোধে সরকার প্রয়োজনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা মেশিন লার্নিংভিত্তিক অসঙ্গতি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি যুক্ত করতে পারবে। অর্থাৎ একজন আবেদনকারীর আয়, সঞ্চয়, জমি, যানবাহন, কর প্রদান বা অন্য কোনো সরকারি সুবিধা গ্রহণের তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে তা প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।