নেপাল ট্র্যাজেডি

জীবিত উদ্ধারের আশা কমছে নিহত বেড়ে ৭৩৪

নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পাঁচ দিন পেরিয়েছে। ভয়াবহ এই দুর্যোগে দেশি-বিদেশি নাগরিকসহ দুই দেশে এখনো ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। সময় যতই গড়াচ্ছে, ততই নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হচ্ছে। এই প্রতিবেদনে লেখার সময় পর্যন্ত নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষ ৭৩৪ জনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করেছে। আরেকটি আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কার কারণে উদ্ধারকাজও ব্যাহত হচ্ছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, গত বুধবারের হিমবাহ ধসের পর ওই এলাকায় দুটি নিহত বেড়ে ৭৩৪ নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। এদিকে উদ্ধার করা যেসব মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, শেষকৃত্যের আগে তাদের ডিএনএ নমুনাসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ করার কথা জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। নেপালি সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, দুর্গত এলাকাগুলোয় ওষুধ ও সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের হিসাবে, এই দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে।

গত শুক্রবার থেকে খারাপ আবহাওয়া এবং নেপাল-চীন সীমান্তে সৃষ্ট দুটি কৃত্তিম হ্রদ নিয়ে উদ্বেগের কারণে কয়েক দফায় উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়েছে। একটি তৈরি হয়েছে হিমবাহের কাছাকাছি উঁচু এলাকায়। অন্যটি নেপালের লেন্দে নদীতে; এটি আকারে বড় এবং তুলনামূলকভাবে বেশি বিপজ্জনক। ওই হ্রদ থেকে পানি উপচে নেপালের লেন্দে খোলা ও ত্রিশূলী নদীতে প্রবাহিত হওয়ায় আরও বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। নেপালের স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, নতুন করে বৃষ্টিপাতের পর ত্রিশূলী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীদের অনেকে নিরাপদে উঁচু এলাকায় সরে গেছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, গত শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে হ্রদটির বেশিরভাগ পানি নেমে যায়। তবে রাতেই হ্রদটিতে প্রায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার এলাকায় নতুন একটি ভূমিধস শনাক্ত করেছে নজরদারি ড্রোন। নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পাওয়ান ভট্টরাই বলেন, ‘এ ধরনের খাড়া উপত্যকায় বাঁধ সামান্য ভেঙে গেলেও খুব দ্রুতগতির পলি ও ধ্বংসাবশেষ বহনকারী বন্যা তৈরি হতে পারে। এতে নিচের দিকে থাকা মানুষজন সতর্ক হওয়ার খুব কম সময় পাবে।’

এদিকে নিখোঁজদের খোঁজে কয়েক দিন ধরে হাসপাতাল, মর্গ ও ত্রাণকেন্দ্রে ছুটে বেড়াচ্ছেন স্বজনরা। এর মধ্যেই মরদেহ সংরক্ষণে হিমশিম খাওয়ায় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নিÑ এমন শত শত মরদেহ গণদাফন শুরু করেছে কর্র্তৃপক্ষ। সামাজিক মাধ্যমে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের এক বিবৃতির বরাতে দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, পরিচয়হীন মরদেহের ডিএনএসহ অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনা করবে সরকার। শনাক্ত হয়েছেÑ এমন মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। বালেন্দ্র শাহ জানান, উদ্ধার করা মরদেহগুলো এয়ারটাইট ব্যাগে রাখা হচ্ছে। ‘পরিচয়হীন ও দাবিহীন মরদেহ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা-২০২৬’ অনুযায়ী সেগুলোর ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও জানান বালেন্দ্র শাহ।

গতকাল রবিবার চিতওয়ানে ২৫৯টি, নবলপরাসী (পূর্ব) জেলায় ১৮৪টি, নবলপরাসী (পশ্চিম) জেলায় ৮২টি, গোর্খায় ৫৮টি, নুয়াকোটে ৫২টি, ধাদিংয়ে ৫০টি, তানাহুনে ৩৬টি এবং রাসুয়ায় ১৩টি মরদেহ ও দেহাবশেষ উদ্ধার হয়েছে। নেপালে নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৪৯৮ জন। তাদের মধ্যে ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী, ৫৮৯ জন বিদেশি নাগরিক এবং বিদেশি পর্যটকদের সঙ্গে ভ্রমণ করা ১২৭ জন নেপালি রয়েছেন। তিব্বতের শিগাতসে শহরের গিরোং কাউন্টিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি। এর আগে তিব্বতে সাতজনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করা হয়েছিল। সেখানে এখনো ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

ওষুধ ও সুপেয় পানির সংকট : দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে ওষুধ ও সুপেয় পানির তীব্র সংকট। ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়শিবিরে থাকা দীর্ঘমেয়াদি রোগীরা নিয়মিত ওষুধ পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে নিরাপদ পানির অভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। ত্রিশূলী বাজারের বাসিন্দা রেখা দেবী গোসাই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছেন। বন্যায় তার বসতভিটা ও চারটি দোকান ভেসে গেছে। এখন পরিবারসহ ত্রিশূলী হাসপাতালের কাছে একটি আশ্রয়শিবিরে অবস্থান করছেন। তবে তিন দিন ধরে তিনি নিয়মিত ওষুধ পাচ্ছেন না। রেখা দেবীর ছেলে রঘুবীর জানান, তার মায়ের প্রতিদিন নিয়ম করে ওষুধ খেতে হয়। কিন্তু হাসপাতালেও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না।

বন্যায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় জরুরি রোগী পরিবহনও কঠিন হয়ে উঠেছে। আশ্রয়শিবিরে থাকা রঘুবীরের শ্যালিকার প্রসববেদনা উঠলে তাকে সড়কপথে কাঠমান্ডু নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে শনিবার তাকে আকাশপথে কাঠমান্ডুর পরোপকার প্রসূতি ও নারী হাসপাতালে নেওয়া হয়। ত্রিশূলী হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট মহেশ্বর যাদব জানান, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের মজুদ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। অন্য অনেক ওষুধও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। হাসপাতালের তথ্য কর্মকর্তা রিকেশ রানা জানান, আশপাশের আশ্রয়শিবিরে থাকা বহু মানুষের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হাঁপানি রয়েছে। কিন্তু তাদের প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

ওষুধের পাশাপাশি তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির। বন্যায় এলাকার পানির উৎসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্যানেল ধসে যাওয়ার পাশাপাশি তুপচের মূল পানির পাইপলাইনও ভেসে গেছে। ফলে দুর্গত মানুষ অনিরাপদ ও অপরিষ্কার পানি ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছে। ত্রিশূলী হাসপাতালের পাশে ভাগতার এলাকায় তিনটি বড় আশ্রয়শিবিরে প্রায় এক হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও প্রসূতিও রয়েছেন। কিন্তু এসব শিবিরে পর্যাপ্ত পানি ও শৌচাগারের ব্যবস্থা না থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ছে। ত্রিশূলী হাসপাতালের চিকিৎসা তত্ত্বাবধায়ক ডা. রাজেন্দ্র লামা বলেন, বিপুলসংখ্যক মানুষ গাদাগাদি করে থাকায় পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিরাপদ পানি ও সঠিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে যেকোনো সময় বড় ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।