সুগন্ধি চালের বাজার চড়া ‘অতি মজুদে’

রপ্তানির অনুমোদন অস্থির করে তুলেছে সুগন্ধি চালের বাজার। বড় পরিসরে রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ার পর থেকে ব্যাপক মজুদ করতে শুরু করেছে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান। ফলে স্থানীয় বাজারে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। বাজারে সুগন্ধি চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে সাধারণ ভোক্তার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি কেজি সুগন্ধি চাল রপ্তানি করা হচ্ছে ১ দশমিক ৬০ ডলারে। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা করে হিসাব করলে এই দাম দাঁড়ায় ১৯৬ টাকা ৮০ পয়সা। এতে করে চাল রপ্তানির জন্য মরিয়া কোম্পানিগুলো স্থানীয় বাজারে দাম বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ঢাকার বাজারে কালোজিরা ও চিনিগুঁড়া চাল বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড নামে প্যাকেট করে বাজারজাত করে। আবার এরাই রপ্তানিতে জড়িত। এসব প্রতিষ্ঠানই এখন বাজারের মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকার বাজার ঘুরে দেখা যায়, স্কয়ারের চাষি, রূপচাঁদা, এসিআইয়ের অ্যারোমা, মেঘনার ফ্রেশসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত সুগন্ধি চাল কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকায়। বিক্রেতারা জানান, গত জুলাইয়ের শেষভাগে প্যাকেটজাত প্রতি কেজি চালের দাম এক লাফে ৪০ টাকা বাড়িয়ে দেয় কোম্পানিগুলো। তবে খোলা চালের দাম প্যাকেটের তুলনায় খানিকটা কম।

খুচরা দোকানি ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ব্র্যান্ডগুলো প্যাকেটজাত সুগন্ধি চাল ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছে। ফেব্রুয়ারিতে এই দাম বাড়িয়ে ১৭৫ টাকা করা হয়। এর দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে দাম আরও বাড়িয়ে ১৯০ টাকা করা হয়। সেখান থেকে সর্বশেষ ৪০ টাকা বাড়িয়ে এখন ২৩০ টাকায় প্রতি কেজি সুগন্ধি চাল বিক্রি করা হচ্ছে। সাত মাসের ব্যবধানে সুগন্ধি চালের দাম কেজিতে ৮০ টাকা বা তারও বেশি বেড়েছে।

এর পেছনের প্রধান কারণ হিসেবে রপ্তানির অনুমোদন পাওয়াকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে সরবরাহ কমিয়ে মজুদ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নামার কারণেই দাম বেড়েছে।

মেরুল বাড্ডার মুদি দোকান মিজান সুপার স্টোরের মালিক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্যাকেটজাত সুগন্ধি চালের সরবরাহ কিছুটা কম। অন্যদিকে দাম বাড়ানো হলেও কমেছে বিক্রেতাদের কমিশন। কোম্পানিগুলো এখন শুধু সুগন্ধি চালের অর্ডার নেয় না, এর সঙ্গে অন্য পণ্যও নিতে হয়।’

মিরপুর-১ এর পাইকারি প্রতিষ্ঠান কাদের রাইস এজেন্সির শাহিনুর রহমান বলেন, ‘পাইকারি দর হিসেবে ভালো মানের সুগন্ধি চালের দাম এখন ১৯০ টাকা। সরবরাহ থাকলেও দামটা বেড়েছে।’

সুগন্ধি চালের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণ নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির চলতি মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাজারজাতকারী ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, সরকার বড় পরিসরে সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। আর এই রপ্তানির অনুমোদনকে কেন্দ্র করেই সুগন্ধি চালের বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। বৈঠকে কয়েকটি কোম্পানির প্রতিনিধিরাই জানান, বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপকহারে চাল মজুদ করছে। এই চাল রপ্তানির জন্য তারা বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় দামে লাগাম টানা যাচ্ছে না।

বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ১৮৯টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ২৫ হাজার টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠান গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত ১৪ হাজার ১৫৪ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি করতে পেরেছে। পরে খাদ্য মন্ত্রণালয় বাকি ১০ হাজার ৮৪৬ টন ও অতিরিক্ত ৫০ হাজার টনসহ মোট ৬০ হাজার ৮৪৬ টন সুগন্ধি চালের সর্বনিম্ন রপ্তানিমূল্য (এফওবি) প্রতি কেজি ১ দশমিক ৬০ ডলার দরের শর্ত দেওয়া হয়। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ১৩ মে ও ১৪ জুলাই দুটি স্মারকে মোট ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে আরও ৪৫ হাজার ২৭০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেয়।

বৈঠকে উপস্থিত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগই রপ্তানির অনুমতির কারণে বাজারে দাম বাড়েনি বলে দাবি করলেও বুশরা এগ্রো অ্যান্ড জুট ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী মো. বেল্লাল হোসেন অভিযোগ করেন, ‘দেশে বড় ১০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে সর্বোচ্চ পরিমাণ সুগন্ধি চাল মজুদ রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে চাল না দেওয়ার কারণে বর্তমানে দাম বেড়েছে।’

তবে অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, কোম্পানিগুলো সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে তা চালে পরিণত করে দেশে বাজারজাত এবং বিদেশে রপ্তানি করে থাকে। তবে বর্তমানে কোনো কৃষকের কাছে ধান পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দাম বেড়েছে।

সূত্র জানায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুগন্ধি চালের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি ঠেকাতে কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। শুধু বাজার মনিটরিংয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে রপ্তানি সংকুচিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এজন্য আগে অনুমোদন দেওয়া রপ্তানি কোটা পুনর্বিবেচনা করে তা কমানো, বাতিল বা সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে মন্ত্রণালয়। এ ধারাবাহিকতায় গত ১৩ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-২ শাখা থেকে জারি করা এক চিঠিতে তিন কর্মদিবসের মধ্যে কারা কত পরিমাণ চাল রপ্তানি করেছে সে বিষয়ে তথ্য দিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে পরে রপ্তানির কোটা কমানো হতে পারে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, ২৭ আগস্ট পর্যন্ত ১২৯টি প্রতিষ্ঠান মন্ত্রণালয়কে তথ্য দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, এখন পর্যন্ত তারা মাত্র ২ হাজার ৪১৯ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি করতে পেরেছে।