হরমুজ সংকট ও ধর্মীয়-অর্থনৈতিক ঐক্য

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বৈশি^ক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মধ্যে মুসলিম দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তেহরানে অনুষ্ঠিত ৪০তম আন্তর্জাতিক ইসলামিক ঐক্য সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম দেশের ভূখণ্ড অন্য কোনো মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা উচিত নয়।’ তার বক্তব্যে মূলত মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং অভিন্ন স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। পেজেশকিয়ানের এই আহ্বান এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের অভিঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বৈশি^ক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও পড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পেজেশকিয়ান একই সম্মেলনে মুসলিম দেশগুলোর অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেন। তার মতে, জনসংখ্যা ও ভূ-কৌশলগত গুরুত্বের তুলনায় মুসলিম দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনৈতিক শক্তি এখনো যথেষ্ট নয়।

ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) ৫৭টি সদস্য দেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত। এসব দেশের অনেকগুলোই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র ও স্থলবাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একই সঙ্গে বিপুল জ্বালানি সম্পদ, তরুণ জনগোষ্ঠী এবং বড় ভোক্তা বাজারও রয়েছে তাদের। পেজেশকিয়ানের দেওয়া হিসাবে, ২০২৪ সালে ওআইসির সদস্যদেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনীতির আকার ছিল প্রায় ৯ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্ব অর্থনীতির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এসব দেশের মোট রপ্তানির মাত্র ১৯ শতাংশ ওআইসি সদস্যদেশগুলোর মধ্যেই থেকে যায়। অর্থাৎ ৮০ শতাংশের বেশি রপ্তানি যায় ওআইসির বাইরের দেশগুলোতে। এই পরিসংখ্যান মুসলিম বিশে^র অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি বড় বৈপরীত্য তুলে ধরে। একদিকে রয়েছে বিশাল বাজার, বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান; অন্যদিকে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সংযোগ এখনো তুলনামূলকভাবে দুর্বল। বর্তমান পরিস্থিতিতে পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হওয়ায় সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে এর প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বৈশি^ক বাজারে। এরই মধ্যে অজ্ঞাত একটি বস্তুর আঘাতে হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন লাগার খবর জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও)। ফলে নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তবে ইরান ও কাতারের সম্ভাব্য কূটনৈতিক তৎপরতায় বাজারে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জসিম আল থানি তেহরান সফর করে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা রয়েছে। এই উদ্যোগকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাব্য পথ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

এর প্রভাবে তেলের দাম টানা কয়েক দিন ধরে কমছে। প্রতিবেদনের সময় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ০৭ ডলার বা ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে ৮৬ দশমিক ৭৭ ডলারে নেমেছে। ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ১ দশমিক ১৩ ডলার বা ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৮১ দশমিক ১০ ডলার হয়েছে। ব্রেন্টের ক্ষেত্রে এটি টানা চতুর্থ এবং ডব্লিউটিআইয়ের ক্ষেত্রে পঞ্চম দিনের দরপতন। ইরানকে ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানও পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে রেখেছে। আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও সামরিক দুই ধরনের পদক্ষেপই কার্যকর। একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় ফিরতে তিনি তাড়াহুড়ো করছেন না। এ অবস্থায় কাতারের তেহরান সফর বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কাতার অতীতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংকটে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। ফলে এই সফর শুধু ইরান-কাতার সম্পর্কের বিষয় নয়; বৃহত্তর অর্থে এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা কমানোর একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগ। পেজেশকিয়ানের আহ্বান নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধাও রয়েছে। ওআইসির সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক অবস্থান, পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা অগ্রাধিকার এবং অর্থনৈতিক স্বার্থে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বৈশি^ক শক্তিগুলোর সঙ্গে তাদের ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্কও ঐক্যের পথে জটিলতা তৈরি করে। তবে বর্তমান সংকট একটি বাস্তব শিক্ষা সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে সংঘাত দেখা দিলে তার অভিঘাত খুব দ্রুত সীমান্ত পেরিয়ে যায়। জ্বালানি, খাদ্য, পরিবহন ও আমদানি ব্যয়ের ওপর তার প্রভাব পড়ে বিশ্বের বহু দেশে। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি ও আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্যও হরমুজ সংকট তাই দূরের কোনো ভূরাজনৈতিক ঘটনা নয়। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের ব্যয়ে চাপ তৈরি হতে পারে। বিপরীতে কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরার সুযোগ তৈরি হবে। পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের তাৎপর্য এখানেই, মুসলিম ঐক্যকে শুধু ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তিনি সামনে এনেছেন।

৫৭টি দেশের সম্মিলিত বাজার, বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী, জ্বালানি সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগাতে পারলে মুসলিম বিশে^র অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনেক বাড়তে পারে। তবে সে জন্য সম্মেলনের বক্তব্যের পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তব নীতি, পারস্পরিক আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সমাধান যত দ্রুত কূটনৈতিক পথে এগোবে, ততই কমবে বিশ^বাজারের অনিশ্চয়তা। আর মুসলিম দেশগুলো যদি এই সংকট থেকে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা নিয়ে নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে পারে, তাহলে বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ভবিষ্যতের একটি নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিও তৈরি করতে পারে।

লেখক : যুক্তরাজ্য প্রবাসী কলাম লেখক।

faruk.joshi@googlemail.com