বন্ধ কলকারখানার জন্য ৬ ব্যাংকের অর্থায়ন চূড়ান্ত

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৪১ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্যাকেজে চুক্তিবদ্ধ ১৭টি ব্যাংকের মধ্যে প্রথম ধাপে ছয়টি ব্যাংকের অর্থায়ন চূড়ান্ত হয়েছে। এসব ব্যাংক প্যাকেজে মোট ২৭ হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন করবে। বন্ধ কলকারখানা চালু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), কৃষি ও রপ্তানি খাতের জোগান বাড়াতে এ অর্থায়ন করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, ৪১ হাজার কোটি টাকার এ প্যাকেজের প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর জন্য। দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনের বাইরে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় সচল করা এবং এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়ানোই এ অর্থায়নের মূল লক্ষ্য।

প্যাকেজে চুক্তিবদ্ধ ১৭টি ব্যাংকের মধ্যে প্রথম ধাপে ছয়টি ব্যাংকের অর্থায়ন চূড়ান্ত হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংক দেবে ২০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি অর্থ দিচ্ছে সোনালী ব্যাংক। ব্যাংকটি একাই দেবে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক দেবে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা করে।

অন্যদিকে বেসরকারি খাতের তিন ব্যাংক দিচ্ছে ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইস্টার্ন ব্যাংক ৪ হাজার কোটি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ২ হাজার ৫০০ কোটি এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংক ৩০০ কোটি টাকা দেবে। সব মিলিয়ে ছয় ব্যাংকের অর্থায়ন দাঁড়াচ্ছে ২৭ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংক একাই সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন করছে।

এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে উৎপাদনশীল খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালু করা গেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় ও টেকসই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পেলে তারা আবার উৎপাদনে ফিরতে পারবে। সোনালী ব্যাংক দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে অর্থনীতির প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ প্যাকেজে সর্বোচ্চ অর্থায়নে অংশ নিচ্ছে।

তিনি বলেন, তবে অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রকল্পের সক্ষমতা, ব্যবসার সম্ভাবনা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করা হবে। যাতে অর্থ সঠিক খাতে ব্যবহার হয় এবং ব্যাংকের অর্থও নিরাপদ থাকে, সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এদিকে ৪১ হাজার কোটি টাকার তহবিলের বাকি ১৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা দেবে আরও ১১টি ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলো ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, এনসিসি ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও সাউথইস্ট ব্যাংক। তবে এসব ব্যাংক কে কত টাকা করে দেবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে সূত্র।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ প্যাকেজে সবচেয়ে বেশি ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বন্ধ কলকারখানা চালুর জন্য। এ ছাড়া এসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি, কৃষি ও পল্লী ঋণে ১০ হাজার কোটি, রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি এবং উত্তরবঙ্গে বিশেষ কৃষি অর্থনৈতিক কেন্দ্র গঠনে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

অর্থনীতিতে গতি ফেরানো, উৎপাদন বাড়ানো এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটাতে গত মে মাসে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হচ্ছে। এতে ১৭টি ব্যাংক অংশ নিচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে আরও ১৯ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ গঠনের কথা রয়েছে।

ব্যাংক খাতে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমেছে। উচ্চঝুঁকি, খেলাপি ঋণ এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগেও ধীরগতি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকের উদ্বৃত্ত অর্থ উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, বন্ধ শিল্পকারখানায় অর্থায়নের মাধ্যমে উৎপাদন পুনরায় শুরু করা গেলে একদিকে ব্যাংকের আটকে থাকা ঋণ আদায়ের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও শিল্প উৎপাদন বাড়বে। একই সঙ্গে এসএমই, কৃষি ও রপ্তানি খাতে অর্থপ্রবাহ বাড়লে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা-েও গতি ফিরবে।