ভরা মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ নেই, বিপাকে জেলেরা

ভরা মৌসুম শেষের দিকে চলে এলেও ভোলার মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদী ও সাগর মোহনায় আশানুরূপ ইলিশের দেখা মিলছে না। জেলেদের জালে দু-একটি বড় মাছ ধরা পড়লেও বেশিরভাগ সময় উঠছে ছোট আকারের ইলিশ। ফলে দুই-তিন কেজি ওজনের একটি ইলিশ ধরা পড়লেই সেটি হয়ে উঠছে ঘাটের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

বড় মাছ ঘাটে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সেখানে ভিড় করছেন জেলে, মাঝি, আড়তদার, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। মাছের ওজন ও দাম নিয়ে শুরু হচ্ছে আলোচনা। নিলামকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে উৎসবের পরিবেশ। তবে এই উৎসবের বিপরীত চিত্র নদীনির্ভর জেলেদের জীবনে। মাছ কম পাওয়ায় খরচ তুলতে না পেরে অনেকেই ঋণের চাপে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।

গত ১৪ ও ১৫ আগস্ট ভোলার কয়েকটি নদী ও ঘাটে কিছুটা ইলিশ ধরা পড়েছিল। কিন্তু পরের দুই-তিন দিনে সেই ধারাবাহিকতা আর দেখা যায়নি। এখনো জেলেদের জালে প্রত্যাশা অনুযায়ী ইলিশ উঠছে না। মাঝে মধ্যে বড় কোনো ইলিশ ধরা পড়লেই সেটিকে ঘিরে ঘাটে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হচ্ছে।

একটি বড় ইলিশ ঘাটে আনার পরই শুরু হয় ওজন ও সম্ভাব্য দাম নিয়ে আলোচনা। কেউ জানতে চান মাছটির ওজন কত, কেউ অপেক্ষা করেন নিলামে কত দাম ওঠে তা দেখার জন্য। অনেকে আবার মোবাইল ফোনে ছবি তুলে রাখেন। বড় ইলিশের নিলাম ঘিরে এমন উৎসবের পরিবেশই জানান দিচ্ছে, ভোলার নদীতে বড় ইলিশ এখন কতটা দুর্লভ।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ঘাটে ধরা পড়া বড় ইলিশের ঘটনাগুলোও একই চিত্র তুলে ধরছে। গত ২৪ আগস্ট মনপুরার রামনেওয়াজ মৎস্যঘাটে জেলে কিরণ মাঝির জালে ধরা পড়ে প্রায় দুই কেজি ওজনের একটি ‘রাজা ইলিশ’। বাচ্চু চৌধুরীর মৎস্য আড়তে নেওয়ার পর উন্মুক্ত নিলামে স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী মো. ফিরোজ সাড়ে ৮ হাজার টাকায় মাছটি কিনে নেন। মাছটি দেখতে ঘাটে জড়ো হন জেলে ও সাধারণ মানুষ।

এর চার দিন আগে, ২০ আগস্ট একই রামনেওয়াজ মাছঘাটে শরীফ মাঝির জালে ধরা পড়ে প্রায় দুই কেজি ওজনের আরেকটি বড় ইলিশ। অনি চৌধুরীর গদিতে মাছটি ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।

এর আগে ৭ আগস্ট চরফ্যাশন উপজেলার মেঘনা ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় নাসির মাঝি ও তাঁর সঙ্গীদের জালে ধরা পড়ে ২ কেজি ৬০০ গ্রাম ওজনের একটি বড় ইলিশ। আঞ্জুরহাট বকশী মৎস্যঘাটে নিলামে মাছটি বিক্রি হয় ১৪ হাজার টাকায়।

৬ জুলাই ভোলা সদর উপজেলার তুলাতলী মৎস্যঘাটে ২ কেজি ১৩০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশ ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ২৯ জুন মনপুরার রামনেওয়াজ ঘাটে ২ কেজি ৪০০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশের দাম ওঠে ৯ হাজার ৩০০ টাকা।

২৫ জুন দৌলতখানের মাঝিরহাট ঘাটে ২ কেজি ৬০০ গ্রাম ওজনের একটি বড় ইলিশ ১১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়। একই সময়ে লালমোহনের মেঘনা নদীতে ধরা পড়ে ৩ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশ। নিলামে মাছটি বিক্রি হয় ১১ হাজার টাকায়।

এ ছাড়া ২০ জুন মনপুরার রামনেওয়াজ মৎস্যঘাটে কামাল মাঝির ধরা ২ কেজি ৮০০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশ বিক্রি হয় ৯ হাজার টাকায়।

এসব ঘটনায় গত কয়েক মাসে ভোলার বিভিন্ন ঘাটে বড় ইলিশ ধরা পড়ার প্রমাণ মিললেও সংখ্যায় তা খুবই কম। তাই এমন মাছ ঘাটে উঠলেই তা নিয়ে তৈরি হচ্ছে ব্যাপক আলোচনা।

তবে বড় ইলিশের এই বিচ্ছিন্ন উপস্থিতি সাধারণ জেলেদের সংকট কাটাতে পারছে না। নদীতে পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় অনেক জেলেই জ্বালানি, খাবার ও শ্রমিকের খরচ পর্যন্ত তুলতে পারছেন না। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য কোথাও কোথাও ইঞ্জিনচালিত ট্রলার রেখে দাঁড়ের নৌকা নিয়েও নদীতে নামছেন তাঁরা। এতে পরিশ্রম বাড়লেও মাছ পাওয়ার নিশ্চয়তা মিলছে না।

জেলেদের দাবি, প্রতিবার নদীতে নামার পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়, অনেক সময় সেই পরিমাণ মাছও পাওয়া যায় না। ফলে মাছ ধরতে যাওয়ার সঙ্গে আয় বাড়ার বদলে তাঁদের দেনা বাড়ছে। ধারদেনা করে জাল ও ট্রলার নিয়ে নদীতে নামা অনেক জেলের জন্য এখন ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে উঠেছে।

জেলে নুরউদ্দিন, বশির ও ইলিয়াস বলেন, কয়েক বছর আগেও আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে নদীতে গেলে নিয়মিত ভালো ইলিশ পাওয়া যেত। এখন অনেক সময় কয়েক দফা জাল ফেলেও আশানুরূপ মাছ মেলে না। অথচ ট্রলারের জ্বালানি, খাবার, শ্রমিকের মজুরি এবং পরিবারের খরচ ঠিকই চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

মাঝি মাহাবুব, আলাউদ্দিন, কামাল ও জুয়েল বলেন, লাখ লাখ টাকা ধার করে তাঁরা জাল ও ট্রলার তৈরি করেছেন। আগে একবার জাল ফেললেই যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যেত, এখন সেই মাছ পেতে একাধিকবার জাল ফেলতে হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়লেও আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না।

জেলেদের সংকটের প্রভাব পড়ছে আড়তদারদের ওপরও। অনেক আড়তদার আগাম টাকা দিয়ে জেলেদের জাল ও ট্রলার পরিচালনায় সহায়তা করেন। কিন্তু মাছ কম পাওয়ায় সেই দাদনের টাকা ফেরত পাওয়াও তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ফলে নদীতে ইলিশের ঘাটতি ধীরে ধীরে পুরো ইলিশ অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।

ভোলা সদরের ইলিশা মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. বাদশা মিয়া বলেন, ইলিশ না পাওয়ায় দীর্ঘদিন আড়তদার ও ব্যবসায়ীরাও দুশ্চিন্তায় ছিলেন। ঢাকার মোকামের মালিকদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে মাছ সরবরাহ করতে না পারায় অনেকেই চাপের মধ্যে পড়েছিলেন। নদীতে ইলিশের পরিমাণ বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল, কিন্তু এখন আবার সরবরাহ কমে গেছে।

মনপুরা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার বলেন, এখন ইলিশের ভরা মৌসুম। তবে সব সময় একই পরিমাণ মাছ পাওয়া যায় না। বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়াকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সামনে বৃষ্টিপাত বাড়লে আরও বেশি ইলিশ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন বলেন, বর্তমানে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। তারপরও মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশ কম ধরা পড়ছে। ইলিশ সাগর ও নদী উভয় জায়গাতেই চলাচল করে। নদীতে অসংখ্য ডুবোচর থাকায় ইলিশের চলাচলে বাধা তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ জালসহ বিভিন্ন কারণেও ইলিশের পরিমাণ কমতে পারে। আরও এক-দুই মাস অপেক্ষা করলে ইলিশের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা যাবে।

ভোলার মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ২৮৩ জন। এর মধ্যে ভোলা সদরে ২২ হাজার ৪১২, দৌলতখানে ২৪ হাজার ৩, বোরহানউদ্দিনে ১৯ হাজার ৮৩৮, তজুমদ্দিনে ১৯ হাজার ৫৭২, লালমোহনে ২৪ হাজার ৮০৬, চরফ্যাশনে ৪৪ হাজার ৩১১ এবং মনপুরায় ১৫ হাজার ৩৪১ জন জেলে রয়েছেন।

মৎস্যসংশ্লিষ্টদের মতে, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, ডুবোচর, পরিবেশদূষণ, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার এবং জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণে ঘাটতির মতো বিষয় ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দু-একটি বড় ইলিশ ধরা পড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নদীতে ইলিশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

ভোলার ইলিশ অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেলে, মাঝি, আড়তদার, দাদনদার, পাইকার, পরিবহন ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতাসহ হাজারো মানুষের জীবিকা। নদীতে মাছের প্রাপ্যতা কমে গেলে এর প্রভাব পড়ে পুরো ব্যবস্থায়।

ভোলার নদীপাড়ে এখন তাই দেখা যাচ্ছে এক বৈপরীত্য। একটি বড় ইলিশ ধরা পড়লেই ঘাটে উৎসবের আমেজ তৈরি হচ্ছে। মানুষ ছুটে আসছেন মাছটি দেখতে। অন্যদিকে একই নদীতে প্রতিদিন জাল ফেলেও কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে অসংখ্য জেলের। তাঁদের সামনে এখন একটাই প্রশ্ন—পরের জালে মাছ উঠবে, নাকি আরও বাড়বে ঋণের বোঝা।