গুম হওয়া সন্তানের ছবি গলায় ঝুলিয়ে মায়ের অপেক্ষা

ফেনীতে গুমের শিকার যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান রিপনের ১২ বছরেও কোনো সন্ধান পাননি তাঁর মা রওশন আরা বেগম। সন্তানের ফেরার আশায় এখনো অপেক্ষা করছেন তিনি। ছেলের ছবি গলায় ঝুলিয়ে প্রশাসন ও সাংবাদিকদের কাছে ছেলেকে খুঁজে দেওয়ার আবেদন জানাচ্ছেন এই মা।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে রবিবার (৩০ আগস্ট) ফেনী প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশে ছেলের ছবি গলায় ঝুলিয়ে উপস্থিত হন রওশন আরা। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ফেনী ইউনিট এ কর্মসূচির আয়োজন করে। এতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজন ও মানবাধিকার সংগঠকেরা অংশ নেন।

সমাবেশে রওশন আরা বেগম বলেন, ২০১৪ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে র‍্যাব তাঁর ছেলে যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান রিপনকে তুলে নিয়ে যায়। তাঁর অভিযোগ, এ ঘটনার পেছনে আওয়ামী লীগের ফেনীর এক প্রভাবশালী নেতা জড়িত ছিলেন। ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর কোনো হদিস পাননি তিনি। এমনকি থানা পুলিশও মামলা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন রওশন আরা।

তিনি বলেন, তাঁর মতো একজন মা ছেলের বিচারের দাবিতে ১২ বছর ধরে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, কিন্তু এখনো বিচার পাননি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাঁর ছেলের গুমের বিচার করবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি। একই সঙ্গে রিপনের মতো আর কেউ যেন গুমের শিকার না হন, সে জন্য রাষ্ট্রকে জোরালো ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান।

এর আগে ফেনী প্রেসক্লাব মিলনায়তনে অধিকার ফেনী ইউনিটের আয়োজনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন রওশন আরা বেগম। ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এ কে এম আব্দুর রহিমের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য দেন ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রবিউল হক রবি, মুহাম্মদ আবু তাহের ভূঁইয়া, সাপ্তাহিক আনন্দ তারকার সম্পাদক এম মামুনুর রশিদ, বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় মহাসচিব মহিউদ্দিন খন্দকার এবং লায়ন্স ক্লাব অব ফেনীর প্রেসিডেন্ট লায়ন জাফর উল্লাহ।

অধিকার ফেনী ইউনিটের ফোকাল পার্সন সাংবাদিক নাজমুল হক শামীমের সঞ্চালনায় সভায় মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনটির সদস্য জাফর আহমদ ভূঁইয়া।

এ ছাড়া বক্তব্য দেন সাপ্তাহিক স্বদেশপত্র সম্পাদক এন এন জীবন, দৈনিক অজেয় বাংলার নির্বাহী সম্পাদক শাহজালাল ভূঁইয়া, এনজিও ফেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা কাজী সালাউদ্দিন নোমান, ক্রীড়া সংগঠক ইমন উল হক, আমার বাংলাদেশ (এবি) যুব পার্টির সদস্যসচিব ইব্রাহিম সোহাগ এবং ফেনী জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আহমদুল হক খোকনসহ অন্যরা।

মানববন্ধন ও সমাবেশে গুমের শিকার মাহবুবুর রহমান রিপনের বড় ভাই মাহফুজুর রহমান সোহাগ, চাচা ওয়াহিদুর রহমান, মাসিক মৌলিক পত্রিকার সম্পাদক নুরুল আফসার, সাপ্তাহিক ফেনী সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা মুহিত, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী নসু, মানবাধিকার সংগঠক মোস্তফা কামাল বুলবুল, আমিনুল ইসলাম শাহীন, মো. শহিদুল ইসলাম মিশু ও সংগঠক রাসেল চৌধুরসহ সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

অধিকার তাদের প্রতিবেদনে জানায়, ৩০ আগস্ট গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর ‘গুম হওয়া থেকে সমস্ত ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ’ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। ২০১০ সাল থেকে এটি কার্যকর হয়।

প্রতিবেদনে অধিকার আরও দাবি করে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে গুমকে ব্যবহার করেছে। এ সময়ে বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ভিন্নমতাবলম্বীসহ সাধারণ নাগরিকেরা গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হন বলে সংগঠনটি উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি, গোপন বন্দিশালাগুলোতে সরকারের বিরোধিতাকারী এবং ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে সোচ্চার ও প্রতিবাদী ব্যক্তিদের গুম করে নির্যাতন করা হতো।

অধিকারের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। ৮ আগস্ট ২০২৪ অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ ‘গুম হওয়া থেকে সমস্ত ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ’ অনুমোদন করে। এর ফলে গুমের বিরুদ্ধে দেশের অভ্যন্তরীণ আইন প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে।

তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ সংসদে পাস না হওয়ায় অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অধিকার জানায়, গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন করে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়ায় শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা পুলিশকে দেওয়া হয়েছিল। পরে গত ২৭ আগস্ট কিছু পরিবর্তন এনে খসড়াটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়।

আইনের ১৪(৩) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা এর সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত সংশ্লিষ্ট বাহিনী করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে সরকার অভিযুক্ত বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো বাহিনী বা আন্তবাহিনী তদন্ত দলের কাছে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবে।

তবে অধিকার মনে করে, এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নযোগ্য নয়। সংগঠনটির মতে, পুলিশসহ যেকোনো শৃঙ্খলা বাহিনী গুমের তদন্ত করলে তা পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে এবং তাদের তদন্ত প্রায়ই পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রতীয়মান হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

অধিকার ও গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের তথ্যের বরাত দিয়ে সংগঠনটি বলেছে, গুমের ঘটনায় এক বাহিনীর পরিচয়ে অন্য বাহিনী মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। ফলে নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া কোন বাহিনী গুমের সঙ্গে জড়িত ছিল, তা জানা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে প্রস্তাবিত আইনের ২১ ধারায় বলা হয়েছে, তদন্তে অভিযোগটি আদালতে মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে। অধিকার মনে করে, এর ফলে বিচারহীনতার পথ আরও প্রশস্ত হবে এবং গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবার অভিযোগ দায়ের করতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

অধিকার উল্লেখ করেছে, আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ এ ধরনের মামলার তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর দেওয়া হয়েছিল। সংগঠনটির দাবি, গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দিতে হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও গুমের ঘটনা ঘটেছে। এতে গুমের শিকার ব্যক্তি, তাঁদের পরিবার এবং মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সরকারের কাছে অধিকারের তিন দাবি

১. গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না দিয়ে স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর দিতে হবে এবং বিষয়টি আইনে উল্লেখ করতে হবে।

২. গুমের পর এখনো ফিরে না আসা ব্যক্তিদের স্ত্রী ও সন্তানরা যাতে তাঁদের ব্যাংক হিসাব পরিচালনা এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করতে হবে।

৩. গুমের পর ফিরে আসা ব্যক্তিদের অনেকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। অধিকার বলেছে, কারও কারও ক্ষেত্রে মিথ্যা সাক্ষ্য বা নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে নিম্ন আদালতের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। এসব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।