ভোলায় স্ত্রী হত্যা, ২১ বছর পর স্বামীর মৃত্যুদণ্ড

ভোলায় স্ত্রী বিলকিসকে হত্যার পর মরদেহে আগুন দিয়ে হত্যাকাণ্ডকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত ও লাশ গুমের চেষ্টার মামলায় মো. বশির নামে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। হত্যাকাণ্ডের প্রায় ২১ বছর পর দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সোমবার (৩১ আগস্ট) এ রায় ঘোষণা করা হয়।

সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে ভোলার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-২-এর বিচারক মো. এনায়েত উল্লাহ এ রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বশির ভোলা সদর উপজেলার বাপ্তা ইউনিয়নের মুসাকান্দি গ্রামের আবদুর রশিদের ছেলে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০০৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত আনুমানিক ১১টা থেকে পরদিন ভোর সাড়ে ৩টার মধ্যে কোনো একসময় বশির তার স্ত্রী বিলকিসকে নিজ বসতঘরে হত্যা করেন। পরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত এবং মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে বিলকিসের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে তার মুখ, গলা, ঘাড়, বুক ও পাঁজরসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে যায়।

অভিযোগ অনুযায়ী, স্ত্রীকে হত্যার পর তার মৃত্যু নিশ্চিত করে বশির ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। এ সময় তিনি তাদের দুই সন্তানকে বাড়িতে রেখে যান। তখন মেয়ে খাদিজা খাতুনের বয়স ছিল ৯ বছর এবং ছেলে মো. ইমরানের বয়স ছিল মাত্র দেড় বছর। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই বশির দীর্ঘ সময় পলাতক ছিলেন।

মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ঘটনার পর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং আসামিকে আইনের আওতায় আনতে তদন্ত শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলে। এর মধ্যে প্রায় ২১ বছর পলাতক থাকার পর ২০২৫ সালে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন বশির। এরপর মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম আরও এগিয়ে যায়।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ বিভিন্ন সাক্ষী ও প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে। আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে রাষ্ট্রপক্ষ আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে মামলার সংশ্লিষ্টরা জানান। পরে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মো. বশিরকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আদালত।

মামলার উল্লেখযোগ্য সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন সর্বশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহজাদা মো. আসাদুজ্জামান। বর্তমানে তিনি অতিরিক্ত উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন্স), পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকায় কর্মরত। মামলাটির তদন্তের সময় তিনি ভোলার সদর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আদালতে মামলার তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সাক্ষ্য দেন।

এছাড়া নিহত বিলকিসের মরদেহের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. রথীন্দ্রনাথ মজুমদারও আদালতে সাক্ষ্য দেন। মামলার বিচারকালে তার সাক্ষ্যসহ অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতের বিবেচনায় আসে।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন ভোলার অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মো. হাবিবুর রহমান (বাচ্চু)। আসামিপক্ষে সর্বশেষ আইনজীবী ছিলেন অতীন্দ্র লাল ব্যানার্জী।

প্রায় দুই দশক আগের এ হত্যাকাণ্ডের মামলায় সোমবার রায় ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ সময় পলাতক থাকার পর ২০২৫ সালে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন বশির। এরপর সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ ও যুক্তিতর্কসহ বিচারিক কার্যক্রম শেষে আদালত তাকে স্ত্রী হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন।

আদালতের এ রায়ের মধ্য দিয়ে ২০০৫ সালে সংঘটিত বিলকিস হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হল। তবে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষের আইনগত সুযোগ ও পরবর্তী কার্যক্রম প্রচলিত আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।