বিভিন্ন আদালতে ১০ জনের মৃত্যুদন্ড

দেশের বিভিন্ন আদালতে ১০ জনের মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জামালপুরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় ইউপি সদস্যসহ তিনজনকে, ঢাকায় কেরানীগঞ্জে অটোচালক হত্যায় তিনজনকে, বগুড়ায় মুদি দোকানি হত্যায় দুইজনকে, ময়মনসিংহে অটোচালক হত্যায় একজনকে ও ভোলায় স্ত্রী হত্যার দায়ে স্বামীকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে আদালত প্রতিবেদক ও সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর

আদালত প্রতিবেদক জানান, প্রায় ছয় বছর আগে ঢাকার কেরানীগঞ্জে জুয়েল নামে একজনকে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনায় তিনজনকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে আদালত। গতকাল সোমবার ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মুহাম্মদ মুনির হোসাইন এ রায় দেন। দন্ডপ্রাপ্তরা হলেন আলী হোসেন, লুৎফর রহমান ও হাসান। পাশাপাশি আসামিদের ৫ লাখ টাকা করে অর্থদন্ড, অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ছিনতাইয়ের অপরাধে এ তিন আসামিকে ৫ বছর করে কারাদন্ডের পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা করে অর্থদন্ড, অনদায়ে আরও তিন মাসের কারাদন্ড দিয়েছে আদালত। ছিনতাইকৃত অটোরিকশা জেনেও তা কেনার দায়ে গ্যারেজ মালিক আহমদুর রহমানকে তিন বছরের কারাদন্ড এবং ৩০ হাজার টাকা অর্থদন্ড, অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের অর্থদন্ডের মধ্যে ১৫ লাখ টাকা নিহতের পরিবার ও সন্তানদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে হবে। রায় শেষে আসামিদের কারাগারে পাঠানো হয়। আহমদুর রহমান পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন বিচারক।

মামলার অভিযোগে জানা যায়, ২০২০ সালের ১৫ অক্টোবর বিকেলে আসামিরা যাত্রীবেশে জুয়েলের অটোরিকশা ভাড়া করেন। তারা ভাসানচর কাঠবাগানের দিকে যান। সেখানে পৌঁছানোর পর যোগ হন হাসান ও এক কিশোর। সেই কিশোর অটোরিকশায় বসে থাকে, আর আসামিরা চালক জুয়েলকে হাতন্ডপান্ডমুখ চেপে ধরে ধইঞ্চা ক্ষেতে শ্বাসরোধে হত্যার পর অটোরিকশাটি নিয়ে যায়। তদন্ত শেষে ২০২১ সালে চারজনের নামে অভিযোগপত্র ও কিশোরের বিরুদ্ধে দোষীপত্র দেয় কেরানীগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ। ১৬ জনের সাক্ষ্যে আদালত এ রায় দেয়।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জামালপুরের সদর উপজেলার রশিদপুরে বহুল আলোচিত সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় ইউপি সদস্যসহ তিন আসামিকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে তাদের যাবজ্জীবন কারাদন্ড ও প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ ভুক্তভোগীকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। গতকাল জামালপুর নারী ও শিশুনির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ১ন্ডএর বিচারক মুহাম্মদ আবদুর রহিম এ রায় দেন। এ সময় দন্ডপ্রাপ্ত তিন আসামিই আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

দন্ডপ্রাপ্তরা হলেনÑ জামালপুর সদর উপজেলার রশিদপুর ইউপি সদস্য মো. ছাত্তার আলী, মো. আব্দুল মালেক ও মো. আনু। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফজলুল হক জানান, ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর রাতে রশিদপুর ইউনিয়নের ভাটিপাড়া এলাকায় এক নারীকে অপহরণ করে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে মামলাটি করা হয়। মামলাটিতে একই ব্যক্তিদের অপরাধ ভিন্ন ভিন্ন থাকায় তাদের যাবজ্জীবন ও মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। আদালত ১০ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেন।

বগুড়া প্রতিনিধি জানান, বগুড়া শহরের কৈপাড়ায় মুদি দোকানি রাকিবুল হাসান হৃদয়কে ঈদের চাঁদা না পেয়ে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে হত্যার দায়ে দুইজনকে মৃত্যুদন্ড ও তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছে আদালত। গতকাল দুপুরে বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পঞ্চম আদালতের বিচারক কৌশিক আহমেদ খোন্দকার এই রাায় দেন। প্রত্যেক আসামিকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তরা হলেনÑ বগুড়া সদর উপজেলার ধাওয়াপাড়া এলাকার টিয়া মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেন স্বাধীন ও আসলামের ছেলে রাব্বি। যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্তরা হলেন একই এলাকার মমতাজের ছেলে আশিক, মনু মিয়ার ছেলে মো. শাকিল ও সাফির ছেলে মতিন। এ মামলায় ১৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত এ রায় দেয়। রায় ঘোষণার পর আদালতের বাইরে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মামলার বাদী ও নিহত হৃদয়ের মা আয়শা সিদ্দিকা বলেন, আমার একমাত্র ছেলেকে ঈদের আগের দিন খুন করা হয়। আর ঈদের পরের দিন আমার ছেলের এক পুত্রসন্তান জন্ম নেয়। যে শিশু কোনোদিন তার বাবাকে দেখতে পারল না।

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, ময়মনসিংহে অটোরিকশাচালক নাজিম উদ্দিন হত্যা মামলায় একজনের মৃত্যুদন্ড ও দুইজনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছে আদালত। সোমবার দুপুরে বিশেষ দায়রা জজ আদালতের বিচারক ফারহানা ফেরদৌস এ রায় দেন। মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে ১৬ জানুয়ারি রাতে নাজিমের অটোরিকশায় যাত্রীবেশে ওঠেন আসামিরা। সুহিলা মধ্যপাড়া এলে তারা চালক নাজিমকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে অটোরিকশা নিয়ে পালিয়ে যায়। পলাশকে মৃত্যুদন্ড ও ৩০ হাজার টাকা অর্থদন্ড এবং অপর আসামি নাসিম ও শাকিলকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড অনাদায়ে ৬ মাসের কারাদন্ড দেয় আদালত।

ভোলা প্রতিনিধি জানান, ভোলায় স্ত্রী বিলকিসকে হত্যার পর মরদেহে আগুন দিয়ে হত্যাকান্ডকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত ও লাশ গুমের চেষ্টার মামলায় স্বামী মো. বশিরকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে আদালত। হত্যাকান্ডের প্রায় ২১ বছর পর দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে গতকাল ভোলার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত ২ এর বিচারক মো. এনায়েত উল্লাহ এ রায় দেন। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত বশির ভোলা সদর উপজেলার বাপ্তা ইউনিয়নের মুসাকান্দি গ্রামের আবদুর রশিদের ছেলে। আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০০৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে বশির তার স্ত্রী বিলকিসকে নিজ বসতঘরে হত্যা করেন। পরে হত্যাকান্ডের ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত এবং মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে বিলকিসের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে তার শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে যায়। এ সময় মেয়ে খাদিজা খাতুন (৯) ও দেড় বছর বয়সী ছেলে মো. ইমরানকে ঘরে রেখে বশির পালিয়ে যান। ২০২৫ সালে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন বশির।