গৌরীপুরের বড়শির ছিপ যাচ্ছে সারা দেশে

ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার মইলাকান্ধা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম লামাপাড়া গ্রাম। সেই গ্রামের বড়শী ছিপ যাচ্ছে সারা দেশে। উপজেলা পরিষদ থেকে ৫/৬ কিলোমিটার ভিতরে গ্রামের আকাঁবাকাঁ মেঠোপথ সোনালী ধানের ক্ষেত, বসতি ঘর যেন দূরে দূরে সেই গ্রামের নাম লামাপাড়া।

সরেজমিন মইলাকান্ধা গ্রামে আছে এক কমিনিউটি ক্লিনিক। ক্লিনিকের পিছনেই পুকুরপাড়ে কয়লার পাশেই বসে বড়শী ছিপের কাজ করেন আতাউর রহমান। তিনি কাজের ফাঁকে ফাঁকে জানান, তাদের নানান চড়াই-উৎরাই, অভিজ্ঞতার কথা। অবসর বা অফ সিজনে ছিপ তৈরিতে ফিরেছে তাদের ভাগ্যের চাকা। বর্তমানে এই গ্রামের ১৬ থেকে ১৮ টি পরিবার ছিপ তৈরির কাজ করে।

আতাউর রহমান ছিপ তৈরি শিখেছেন তার বাবার কাছ থেকে। কৃষি কাজ না থাকলে তারা ছিপ তৈরি করেন। প্রতি সিজনে প্রত্যেক পরিবারে মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা আয় হয় তা দিয়ে কোন মতে সংসার চালিয়ে যায়। তবে আয়ের অংকটা নির্ভর করে সদস্য সংখ্যার উপর।

পাশের বাড়ির ছিপ তৈরির কারিগর হযরত মিয়া জানান, বাঁশ সংগ্রহ করি নেত্রকোনা জেলার কমলাকান্ধা ও দূর্গাপুর উপজেলা থেকে। পরে বাঁশগুলো সুন্দর করে ছাচা দিয়ে নেওয়া হয় ছিপ তৈরির কাজে। অনেক আকাঁবাকাঁ বাঁশ থাকে আগুনে পুড়েঁ সোজা করতে হয় এজন্যই লাগে কয়লা ছিদ্র করার যন্ত্র, করাত ও আগুন। আমাদের বাপ চাচারা বাঁশের চোঙ্গায় ফু দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে রাখলেও বর্তমানে ব্যাটারি চালিত ছোট ফ্যান দিয়ে আগুন জালানো হয়। বাঁশগুলো এক গিট পরপর ছিদ্র করতে হয়, না হয় ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কয়লা প্রতি টিন কিনতে হয় ৬০ থেকে ৭০ টাকায়।

সুমন মিয়া নামে আরেকজন জানান, বাড়ীর নারীরা সাধারনত ছাটার কাজটি করেন। একটি ছিপ ছাচতে সময় লাগে ২-৩ মিনিট। আমরা &#39শ&#39 হিসেবে বাঁশ কিনি। একশ বাঁশ কিনা পড়ে ১৫ শ থেকে ২ দুই হাজার টাকায়, ১টি ছিপ বানাতে সময় লাগে ৫ মিনিট। একদিনে একজনে ছিপ বানাতে পারে ৬০-৭০টি। আমরা বড় সাইজ প্রতি শ ৫ হাজার, মাঝারী ৩২ শ ছোট ২৫ শ টাকা ধরে বিক্রি করি। চৈত্র থেকে কার্তিক মাস হলো সিজন। বিক্রি করার সিজন চার মাস। বাকি সময় আমরা বানিয়ে রাখি। এক সিজনে আমরা ১৫-২০ হাজার বাঁশ থেকে ছিপ তৈরি করে বিক্রি করতে পারি। যাদের লোক সংখ্যা বেশি তারা হয়তো আরও একটু বেশি পারে। এটা করেই আমাদের ঘর-সংসার চলে যায়।

বাড়ির উঠানে বাঁশ ছাচতে থাকা আকলিমা খাতুন জানান, কাজে কোন লজ্জা নাই, আমাদের গ্রামে দরিদ্র পরিবারগুলো সবাই এই কাজে ব্যস্ত থাকি। ঢাকা, রাজশাহী, নাটোর, বরিশাল সব জায়গায় প্রায় জেলা গুলো থেকে পাইকাররা এসে নিয়ে যায়। তবে দেশের উত্তর উঞ্চলের বেশীর ভাগ জেলা গুলো আমাদের বড়শীর ছিপ স্পাল্লাই হয় বেশী। পুঁটি, বাইলাসহ বিল-হাওরের মাছ ধরতেই মূলত এই ছিপ ব্যবহার করা হয়। পাইকাররা গাড়ি পাঠিয়ে কিনে নিয়ে যায়।

এ বিষয়ে ৬ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. শহীদুল ইসলাম খান দেশ রুপান্তরকে জানান, পাহাড়ী অঞ্চল থেকে বাঁশ কিনে এনে তৈরি করতে হয়। আমার জানামতে সারা দেশে কিশোরগঞ্জ, গৌরীপুর, মুক্তাগাছা অন্য কোথাও তৈরি হয় না। এটা আমাদের এলাকার অর্থনীতির একটা অংশ। সরকারী ভাবে তাদের সহযোগিতা করা হলে আরও স্বাবলম্বী হতো।

গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আপিয়া আমীন পাপ্পা জানান, আমিও জেনেছি তারা বড়শীর ছিপ তৈরি করে। এটা গৌরীপুরের জন্য সুনামের অন্যদিকে লাভজনক একটি পেশা এতে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ আছে। দেখি তাদের কি ভাবে সরকারি সহায়তা করা যায়।