হিলি স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ, রাজস্ব ঘাটতি ৩ কোটি টাকা

ট্রাকে পণ্য পরিবহনে নতুন নিয়ম জারির প্রতিবাদে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটে তিন দিন ধরে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি রপ্তানি বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। পণ্য আটকা পড়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন আমদানিকারকরা। এদিকে কাজ কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সিআ্যন্ডএফএজেন্টের স্টাফরা। অপরদিকে আয় কমায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন শ্রমিকরা। ধর্মঘটের ফলে রাজস্ব আহরনে ঘাটতিতে পড়েছে কাস্টমস।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকার ট্রাকে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নতুন করে নির্দিষ্ট ওজন নির্ধারণ করে যা গতকাল থেকে কার্যকর করে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৬ চাকার ট্রাকে ৩০ টনের পরিবর্তে ২০ টন, ১০ চাকার ট্রাকে ৪০ থেকে ৪৫ টনের পরিবর্তে সর্বোচ্চ ৩০ টন পণ্য পরিবহনের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন কারনে পশ্চিমবঙ্গের অন্য স্থলবন্দরের সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে হিলি বন্দর। পণ্য পরিবহনে নতুন ওজন নির্ধারণের প্রতিবাদে ও অন্যান্য সকল বন্দরের ন্যায় সুযোগ সুবিধা নিশ্চিতের দাবিতে ভারতের হিলি বন্দরের সকল ব্যবসায়ী সংগঠন যৌথভাবে গতকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পণ্য রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে গত রবিবার থেকে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি রপ্তানি বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে।

হিলি স্থলবন্দরে কর্মরত শ্রমিক আইয়ুব আলী বলেন, ভারতে কি যেন সমস্যা যার কারনে কয়েকদিন থেকে গাড়ি ঢোকা একেবারে বন্ধ রয়েছে। এতে করে আমাদের শ্রমিকদের একদম কাজকাম নাই, বেকার জীবনযাপন করতেছি। পূর্বের যে এক দুটা গাড়ি আছে এসব লোড আনলোড করে আমরা বাড়ি যাচ্ছি। এতে করে হাজরা উঠছেনা একটা গাড়ি করে ১শ থেকে দেড়শো টাকা হাজরা, এই টাকা নিয়ে বাড়ি যাওয়া লাগছে। এতে করে সংসার চালানো একেবারে সুকঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা শ্রমিকেরা খুব কষ্টে জীবনযাপন করতেছি। 

সিএন্ডএফ এজেন্টের কর্মচারী রাইয়ান হোসেন বলেন, ভারতে ধর্মঘটের কারণে বন্দরের অবস্থা প্রচণ্ড খারাপ। ধর্মঘটের কারনে গাড়িঘোড়া কোনোকিছুই ঢুকতেছে না। প্রত্যেক এক্সপির বিপরীতে কিছু কিছু মাল ঢুকছে কিন্তু সেগুলা এখনো ফুল হয়নি। কোনটা ৫ গাড়ির লট, ১০ গাড়ির লট সেই মালগুলা বন্দরে ঢোকার পরেও খালাস করতে পারতেছি না। কারণ ৩টা গাড়ি ঢুকছে, কোনো গাড়ির লটের ৪টা ঢুকছে, ২টা বা ১টা করে গাড়ি বাকি আছে। এই গাড়িগুলা আসতেছে না বিধায় এই গাড়িগুলাও খালি করতে পারতেছি না। গাড়িঘোড়া না ঢোকায় আমাদের স্টাফদের অবস্থা খারাপ শ্রমিকের অবস্থা খারাপ, মহাজনেরা তো সেভাবে বিল দিতে পারতেছে না, কাজকাম একবারে খুবই খারাপ।

হিলি কাস্টমস সিআ্যন্ডএফ এজেন্ট আ্যসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহিনুর ইসলাম বলেন, গত ২৯ আগস্ট ভারতীয় এক্সপোর্টার্স অ্যান্ড সিএন্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন এর পক্ষ থেকে আমাদেরকে একটা চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেই চিঠির আলোকে গত ৩০ আগস্ট রবিবার থেকে আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ আছে। তো আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ থাকলে উভয় দেশেরই ক্ষতি। বাংলাদেশে যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি সরবরাহে ঘাটতির কারনে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। যেমন আজকে গমের বাজার প্রায় কেজি প্রতি ২ টাকা বেড়ে গেছে এই আমদানি বন্ধ হওয়ার কারণে। তারপরে ভুট্টার বাজারও বেড়ে গেছে। তো এটা যদি আরও দীর্ঘদিন চলতে থাকে তাহলে বিভিন্ন আমদানিকৃত পণ্যের দাম আরও বেড়ে যাবে এতে করে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগ পাবে। তো আমরা চাই যে, তাদের মধ্যে প্রশাসনের সঙ্গে যে একটি বৈষম্য রয়েছে, এইটা তারা মিটিয়ে ফেলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তারা রপ্তানি কার্যক্রম শুরু করুক। এতে উভয় দেশেরই উন্নতি হবে বা লাভবান হবে।

হিলি কাস্টমস সিআ্যন্ডএফ এজেন্ট আ্যসোসিয়েশনের সভাপতি ফেরদৌস রহমান বলেন, ভারতের এই ধর্মঘটের ফলে আমরা ব্যবসায়ীরা চরমভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছি। বিশেষ করে অনেক আমদানিকারকের বিভিন্ন ধরনের পণ্য ভারত অভ্যন্তরে আটকা পড়ে আছে। এতে করে তীব্র গরমের কারনে পণ্যের মান খারাপ হওয়ার আশংকা রয়েছে। সেই সাথে দেখা যাচ্ছে একই কনসালমেন্টের কিছু পণ্য বন্দরে ঢুকেছে আবার কিছু পণ্য ভারত অভ্যন্তরে আটকা পড়ে আছে। এতে করে কনসার্নমেন্ট ফুল না হওয়ায় বন্দরে থাকা পণ্য খালাস নিতে পারছেননা যার কারনে বন্দরের বাড়তি মাশুল গুনতে হচ্ছে। তেমনি ভারতে থাকা গাড়িগুলোর ডেমারেজ হিসেবে বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। এছাড়া কাঁচাপণ্যগুলি ভারতের অভ্যন্তরে পাইপ লাইনে থাকায় এসব মালামাল নষ্ট হয়ে যাবে সবমিলিয়ে আমরা ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পরবো। সেই সাথে সরকারের রাজস্ব আহরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তেমনি শ্রমিকরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আমরা আশা করি খুব অল্প সময়ের মধ্যে তারা তাদের ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিবেন। তবে আমরা তাদের সাথে গতকাল ও আজকে যোগাযোগ করেছি তাদের সাথে প্রশাসনের বৈঠক হলেও সেটি ফলপ্রসূ হয়নি যার কারনে তারা তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন।

হিলি কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা প্রিন্স কুমার কুন্ডু বলেন, আমরা তো সবাই অফিসে আছি আমাদের কার্যক্রম ঠিকঠাক স্বাভাবিকভাবেই চলছে। কিন্তু ভারতীয় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বা রপ্তানিকারকরা তারা তাদের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। এজন্য রবিবার থেকে কোনো পণ্য ভারত থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয়নি। তেমনি বাংলাদেশ থেকেও কোন পণ্য ভারতে রপ্তানি হয়নি। এতে করে দেখা যাচ্ছে যে আমাদের রাজস্ব আহরণে ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার মতো আমাদের রাজস্ব ঘাটতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে আরকি। যদি এটা কন্টিনিউ হতে থাকে, তাহলে আমাদের বাৎসরিক যে একটা লক্ষ্যমাত্রা বা রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা থাকে, গতি থাকে, সেটা হয়তো ব্যাহত হতে পারে। তবে গাড়ি যখন ঢোকা স্বাভাবিক হয়ে গেলে তখন হয়তোবা কার্যক্রম আবার যদি বেড়ে যায়, তাহলে আমাদের আবার সেই ঘাটতিটা হয়তো পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পূর্বের মালামাল যেগুলো আছে, সেগুলার কার্যক্রম আমরা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা যারা আসছেন, সব প্রকার ডকুমেন্ট নিয়ে আসলে আমরা সেগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই আমরা করে দেওয়ার চেষ্টা করছি। 

হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া বলেন, বন্দর দিয়ে আমদানি রপ্তানি বাণিজ্য বন্ধ থাকলেও হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশ ভারতের মাঝে পাসপোর্টে যাত্রী পারাপার কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। অন্যান্য দিনের মত ভারত থেকে পাসপোর্ট যাত্রীরা বাংলাদেশে আসছেন তেমনি বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাসপোর্ট যাত্রীরা যাচ্ছেন।