পাকিস্তান ক্রিকেটে সার্কাস

হেডিংলিতে প্রথম টেস্ট শুরুর আগে বিশ্ব গণমাধ্যম স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল ১৯৮৭ সালের সেই ঐতিহাসিক পাকিস্তান দলকে, যারা ইমরান খানের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডের মাটিতে বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে ইংল্যান্ড সফরে আসা পাকিস্তান দল যেন গ্রিক দর্শনের সেই ‘শিপ অব থিসিউস’ যার প্রতিটি কাঠ বদলাতে বদলাতে মূল অবয়বটাই হারিয়ে গেছে। লিডস ও লর্ডসে টানা দুটি লজ্জাজনক হারের পর পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) যা ঘটাল, তা পেশাদার ক্রিকেটের ইতিহাসে বিরল। এক লহমায় বদলে ফেলা হলো দল, কোচিং স্টাফ এবং নির্বাচক প্যানেল।

লর্ডসে ১৯৪ রানের পরাজয়ে সিরিজ হাতছাড়া হওয়ার ২৪ ঘণ্টাও কাটেনি। পিসিবি এক বিজ্ঞপ্তিতে একযোগে ৭ ক্রিকেটারকে সফররত টেস্ট স্কোয়াড থেকে বাদ দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দেয়। ছাঁটাইয়ের তালিকায় পড়েন- মোহাম্মদ রিজওয়ান, ইমাম-উল-হক ও সালমান আলি আগা, আলি ওসমান, আমির জামাল, ওয়াইস জাফর ও খুররম শাহজাদ।

শুধু খেলোয়াড় ছাঁটাই করেই ক্ষান্ত হয়নি বোর্ড। মাত্র ৫টি ম্যাচে প্রধান কোচের দায়িত্বে থাকা সরফরাজ আহমেদ এবং বোলিং কোচ উমর গুলকে মাঝপথেই ছাঁটাই করে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সাদা বলের কোচ মাইক হেসন এবং আশলি নফকে-কে জরুরি ভিত্তিতে লাল বলের দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অপসারিত ক্রিকেটারদের জায়গায় যুক্ত করা হয়েছে ৭ জনকে, যার মধ্যে ৫ জনেরই কোনো টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা নেই!

দল ও কোচিং স্টাফ ছাঁটাইয়ের উত্তাপ শেষ হতে না হতেই পিসিবি নির্বাচক কমিটির দিকে বন্দুক তাক করে। রিজওয়ান ও ইমামকে কেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ড সফরের স্কোয়াডে রাখা হয়েছিল, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার লিখিত ব্যাখ্যা চেয়ে নোটিস পাঠানো হয়।

এই চরম অপমান ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার প্রতিবাদ জানিয়ে নির্বাচক কমিটি ও ন্যাশনাল ক্রিকেট একাডেমির পরামর্শকের পদ থেকে তাৎক্ষণিক পদত্যাগ করেছেন সাবেক সফল অধিনায়ক মিসবাহ-উল-হক। মার্চ মাসে গঠিত আকিব জাভেদ, আসাদ শফিক ও সরফরাজ আহমেদের সঙ্গে যৌথভাবে নির্বাচন কমিটিতে যোগ দেওয়া মিসবাহর এই পদত্যাগ পিসিবির অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থাকে নতুন রূপ দিল।

পিসিবির এই সিদ্ধান্তহীনতার চক্রে সবচেয়ে বিস্ময়কর শিকার স্পিনার আলি ওসমান। হেডিংলিতে প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট পাওয়া এবং কাউন্টিতে সফল এই স্পিনারকে লর্ডস টেস্টে দুই ইনিংস মিলিয়ে মাত্র ১২ ওভার বোলিং করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কোনো সুযোগ না দিয়ে বা সঠিক ব্যবহার না করেই তাকে সোজা দেশে ফেরার বিমানে তুলে দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, দুই মাস আগে পিসিবি বড় আয়োজন করে খেলোয়াড়দের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে লাল বল ও সাদা বলের ফরম্যাট আলাদা করার প্রস্তাব অনুমোদন করেছিল। সেই নীতির রূপকার মাইক হেসনকেই এখন আবার সব ফরম্যাটের অল-ইন-ওয়ান কোচ বানিয়ে টেস্টের দায়িত্ব সামলাতে পাঠানো হচ্ছে।

পাকিস্তান ক্রিকেটের এমন অবস্থা নিয়ে উপহাস করেছেন খ্যাতনামা ক্রিকেট কমেন্টেন্টর হর্ষ ভোগলে। ‘এক্স’-এ তিনি লিখেছেন, ‘অবিশ্বাস্য কিছু ঘটানোর ব্যাপারে পাকিস্তান ক্রিকেটের ওপর নিশ্চিন্তে ভরসা করা যায়... প্রথম টেস্টের অধিনায়ক সালমান আগা দ্বিতীয় টেস্টে বাদ পড়লেন, আর তৃতীয় টেস্টের আগেই তাকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হলো! বিকল্প খেলোয়াড়রা টেস্টের জন্য প্রস্তুত হওয়া তো পরের কথা, সময়মতো ভিসা পাবেন কি না সেই আশায় বসে আছেন।’

পিসিবি প্রধান মহসিন নকভি ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর দলে ‘সার্জারি’র কথা বলেছিলেন। কিন্তু নিখুঁত অস্ত্রোপচারের বদলে বোর্ড বারবার বেছে নিচ্ছে অন্ধ ধ্বংসাত্মক পথ। গ্যারি কারস্টেন কিংবা জেসন গিলেস্পির মতো বিশ্বমানের কোচরা যেখানে মাত্র কয়েকটি ম্যাচের বেশি টিকতে পারেননি, সেখানে মাঠের ব্যর্থতার দায়ভার পুরোপুরি ক্রিকেটার ও কোচদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে প্রশাসনিক কর্তারা বারবার বেঁচে যাচ্ছেন।