শেষের সংকেত বিবিয়ানায়

শেষের সংকেত দিচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ গ্যাস উত্তোলন ক্ষেত্র বিবিয়ানা। কিন্তু পেট্রোবাংলা বিকল্প গ্যাস উত্তোলনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। ক্ষেত্রটির অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য মজুদের পরিমাণ বিবেচনায় আর সর্বোচ্চ ৩ বছর এখান থেকে গ্যাস পাওয়া যাবে। ক্ষেত্রটির মজুদের তথ্য চেয়ে শেভরনকে ই-মেইল করা হলে তারা বিষয়টি এড়িয়ে জানিয়েছে, এ ধরনের তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, ২০২৫ সালের ১ জুলাই বিবিয়ানার উত্তোলনযোগ্য অবশিষ্ট মজুদ ছিল ১ হাজার ৩১৮ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ)। ওই ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্যাস তোলা হয়েছে ৩৪৪ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ঘনফুট। বাৎসরিক একই হারে যদি গ্যাস তোলা হয়, তাহলে এই মজুদে আর ৩ বছরের কম সময় গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। পেট্রোবাংলার হিসাব ধরে মজুদ ও উৎপাদনের হিসাব করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে খনির মজুদ কমে হওয়ার কথা ১ হাজার ৩৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ঘনফুট। উৎপাদনের ধারা ঠিক থাকলে ২০২৯ সালের জুলাইয়ের আগেই খনিটির গ্যাস নিঃশেষ হয়ে যাবে।

ভূতত্ত্বের অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, কোনো গ্যাসক্ষেত্রে তো আর অফুরন্ত মজুদ থাকে না। একসময় এটি শেষ হবেই। বিবিয়ানাতেও তাই হয়েছে। গ্যাসক্ষেত্রটির মজুদ ২০২৯ সালের মধ্যেই শেষ হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তা হতে পারে। এর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া উচিত, সেটি না পারলে আমদানি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলেও জানান তিনি।

ইতিহাস বলছে, অক্সিডেন্টাল এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি ১৯৯৫ সালে পেট্রোবাংলার সঙ্গে ব্লক ১২, ১৩ ও ১৪-এর উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) স্বাক্ষর করে। এরপর অক্সিডেন্টালের অংশীদার হিসেবে ইউনোকল বাংলাদেশে কাজ শুরু করে। এর মধ্যে ১৯৯৮ সালে ইউনোকল-অক্সিডেন্টালের মাধ্যমে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। পরের বছরই ইউনোকল বাংলাদেশে অক্সিডেন্টালের অংশীদারত্ব কিনে নেয়। এরপর ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কোম্পানি শেভরন করপোরেশন ইউনোকলকে অধিগ্রহণ করলে বাংলাদেশে ইউনোকলের থাকা পিএসসিগুলোও শেভরনের হাতে চলে যায়। শেভরন ২০০৭ সালের মার্চে বিবিয়ানা থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উৎপাদন শুরু করে।

বিবিয়ানা থেকে শুরুতে দৈনিক ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু করে শেভরন। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর ক্ষেত্রটি থেকে গ্যাসের উত্তোলন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৪-১৫ সালে ক্ষেত্রটি দৈনিক ১ হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করত, যা ওই সময়ে সরবরাহ করা গ্যাসের অর্ধেকের বেশি। পেট্রোবাংলার ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারির একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই দিন দেশীয় উৎস থেকে ২ হাজার ৫৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র ১ হাজার ৩০১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে গ্যাসের উৎপাদন কমতে শুরু করে। তবে এখনও দেশের মোট গ্যাস উৎপাদনের অর্ধেকের কাছাকাছি সরবরাহ করা হয় বিবিয়ানা থেকে। এখন দৈনিক দেশীয় গ্যাস উৎপাদন হয় ১ হাজার ৬২৫ মিলিয়ন ঘনফুট, যার ৭৩৪ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করে বিবিয়ানা।

এদিকে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রটির মজুদ যদি ২০২৮ সালের দিকে শেষ হয়ে যায়, তাহলে টানা ২২ বছর এখান থেকে রেকর্ড পরিমাণ গ্যাস পাওয়ার নজির তৈরি হবে। ক্ষেত্রটিতে গ্যাস (জিআইপিপি) ছিল ৮ হাজার ৬৬২ বিলিয়ন ঘনফুট বা ৮ দশমিক ৬৬২ টিসিএফ। এর মধ্যে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ ছিল ৭ হাজার ৬৬৬ বিলিয়ন ঘনফুট। এরই মধ্যে গ্যাস তোলা হয়েছে ৬ হাজার ৬৯২ বিলিয়ন ঘনফুট। এখন অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৯৭৪ বিলিয়ন ঘনফুট।

পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, দেশের মধ্যে বড় গ্যাসক্ষেত্র পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। যেখান থেকে বিবিয়ানার মতো একসঙ্গে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস পাওয়া যাবে। নতুন যেসব জায়গায় অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তার একটিও বিবিয়ানার মতো সম্ভাবনাময় নয়। ফলে সেসব জায়গা থেকে কিছু গ্যাস পাওয়া গেলেও তা বিবিয়ানার ঘাটতি পূরণের মতো যথেষ্ট হবে না। দেশের মধ্যে যে গ্যাসক্ষেত্রগুলো রয়েছে, সেখানে ভোলা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রেই এক টিসিএফের ওপরে মজুদ নেই। ফলে দেশের বিদ্যমান ক্ষেত্র থেকেও বড় আকারের গ্যাস উত্তোলন বৃদ্ধির তেমন আশা নেই।

তবে তিতাস, কুমিল্লার মুরাদনগরের শ্রিকাইল ও পাবনার চাটমোহর উপজেলার মোবারকপুর এই তিন গ্যাসক্ষেত্রে ডিপ ড্রিলিং (গভীর খনন) করা হচ্ছে। এর মধ্যে তিতাসে ডিপ ড্রিলিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। এই তিন ক্ষেত্রে ডিপ ড্রিলিংয়ের কাজ শেষ হলে বাংলাদেশের ভূ-পৃষ্ঠের গভীরে গ্যাসের কোনো সম্ভাবনা রয়েছে কি না, তা জানা যাবে। তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ মিটার গভীরতার স্তর থেকে গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এখন তিতাস-৩১ কূপটি ৫ হাজার ৬০০ মিটার পর্যন্ত খনন করা হচ্ছে। তবে গভীরে খনন করলেই যে গ্যাস পাওয়া যাবে, সব সময়, সেই ধারণা ঠিক নাও হতে পারে।

এর বিকল্প রয়েছে কেবল আমদানি করা। তবে গ্যাস আমদানি করতে গিয়ে এখন সরকারের নাজেহাল অবস্থা তৈরি হয়েছে। কাতার ও ওমান থেকে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যে গ্যাস পেত, ইরান যুদ্ধে তা পাওয়া কঠিন হচ্ছে। সেই সঙ্গে স্পট মার্কেটে গ্যাসের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এখন প্রতি কার্গো এলএনজি আমদানি করতে সরকারকে দ্বিগুণের বেশি ৯৮০ কোটি থেকে ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে, যা গত ডিসেম্বরেও ছিল ৪২০ কোটি টাকা। জ্বালানির বাজার স্থিতিশীল না হলে দ্বিগুণ দামেই এলএনজি কিনে প্রয়োজন মেটাতে হবে।

বাংলাদেশ প্রতি মাসে ১০ কার্গো এলএনজি আমদানি করে। এই হিসাবে মাসে ১০ হাজার কোটি টাকা এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে। দাম না কমলে বছরে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এই ব্যয়ের সবটাই হবে বৈদেশিক মুদ্রায়। এখানেই সরকারকে সবচেয়ে বেশি বেগ পেতে হচ্ছে। বিবিয়ানার মজুদ শেষের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যয় আরও কয়েকগুণ বাড়তে পারে।

জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি ও অপারেশন) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, একেবারে ২০২৮ সালে হয়তো শেষ হবে না। তবে এটি শেষ হবে। বিকল্প কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা আমদানির বিষয়টি মাথায় রেখেছি। আমাদের দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর সঙ্গে আমরা আরও একটি ভাসমান টার্মিনাল এবং স্থায়ী টার্মিনাল মিলিয়ে মোট ৩ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানির পরিকল্পনা করছি। এ ছাড়া মহেশখালীতে আরেকটি পাইপলাইন নির্মাণ এবং বাখরাবাদ-ফেনী পাইপলাইন নির্মাণ করতে যাচ্ছি। এসব কিছু এই সংকট সামাল দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ বলে জানান তিনি।