নিয়ম মানেন না ডা. শামসুল আলম

কর্মস্থল দিনাজপুর হলেও ১৩ চেম্বার কক্সবাজারে!

সরকারি বিধিনিষেধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ছুটি না নিয়েই প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে কর্মস্থলে যান না দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শামসুল ইসলাম খান। তবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে কমপক্ষে ১৫টি চেম্বার খুলে নিয়মিত রোগী দেখছেন তিনি। এর মধ্যে শুধু কক্সবাজারেই রয়েছে ১৩টি চেম্বার। কর্মস্থলে না যাওয়ায় তাকে বারবার শোকজ করা হলেও তার জবাব না দিয়ে তিনি বদলি নিতে মন্ত্রী-এমপিসহ আমলাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন ডা. শামসুল। নারী সহকর্মীদের সঙ্গে অশালীন আচরণসহ নানা অভিযোগ ওঠার পর চিকিৎসকদের আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৪ নভেম্বর তাকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি করা হয়। বদলির প্রথম কয়েক মাস নিয়মিত কর্মস্থলে গেলেও চলতি বছরের ১৯ মের পর তিনি আর কর্মস্থলে যাননি। ডা. শামসুল নিয়মিত কর্মস্থলে না যাওয়ায় তার বেতনভাতা বন্ধ রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভাইস-প্রিন্সিপাল ডা. মো. সরওয়ার মোর্শেদ আলম বলেন, ‘ডা. শামসুল সর্বশেষ ১৯ মে কলেজে এসেছিলেন। এরপর দুই দিনের ছুটি নিয়ে আর আসেননি। এ কারণে তাকে ১২ ও ১৮ আগস্ট দুইবার শোকজ করা হয়েছে। কিন্তু তিনি শোকজের জবাব দেননি।’

দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা. শেখ সাদেক আলী (ভারপ্রাপ্ত) বলেন, ‘ডা. শামসুল ইসলাম খান নিয়মিত কর্মস্থলে না আসায় তার বেতনভাতা বন্ধ রাখা হয়েছে। তাকে আমি বহুবার মুঠোফোনে কর্মস্থলে যোগ দিতে অনুরোধ করেছি। কিন্তু সে বারবার অসুস্থতার অজুহাত দেখায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কর্মস্থলে যখন আসতেন তখন ডা. শামসুল আমার কাছে একটি বদলির আবেদন নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু আমার কলেজে শিক্ষক সংকট রয়েছে বলে আমি ফরোয়ার্ড করিনি।’

কর্মস্থলে না যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে ডা. শামসুল বলেন, ‘আমার বয়স হয়েছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা রোগে আমি আক্রান্ত। তাই অতদূরে আমার পক্ষে চাকরি করা সম্ভব না। এই কারণে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে আসার চেষ্টা করছি। সেজন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষের কাছে একটি আবেদন নিয়ে গিয়েছিলাম ফরোয়াডিংয়ের জন্য। কিন্তু তিনি সেটি দেননি।

শোকজের জবাব না দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ওই কলেজে কাজ করতে চাই না। যদি জবাব দিতাম তবে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারতাম না। কিন্তু এখন কর্তৃপক্ষ যেই ব্যবস্থা নেবে তার বিরুদ্ধে আমি আমার আইনি সুরক্ষা নিতে পারব। আমি আমার মনের কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানাতে পারব। তাই আমি শোকজের জবাব দেইনি।’

বেতনভাতা বন্ধের বিষয়ে ডা. শামসুল বলেন, ‘আমার বদলি হয়ে গেলে তখন বেতনভাতার জন্য আবেদন করব। ২৮ বছর ধরে চাকরি করছি। আমার অনেক ছুটি পাওনা রয়েছে। সেই ছুটির বিপরীতেই বেতনভাতা চাইব। বাকি সিদ্ধান্ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের।’

সহকর্মীদের সঙ্গে অশালীন আচরণের কারণে তাকে বদলি করা হয়েছে এ অভিযোগের বিষয়ে ডা. শামসুল বলেন, ‘এসব তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। মূলত তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া তিনি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) আজীবন সদস্য। এই কারণে মিথ্যা অপবাদে তাকে বদলি করা হয়।’

এদিকে নিজেকে বয়স্ক ও নানা রোগে আক্রান্ত দাবি করলেও ডা. শামসুল চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ১৫টি চেম্বার খুলেছেন। এর মধ্যে কক্সবাজার শহর, মহেশখালী, উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া ও পেকুয়ায় রয়েছে ১৩টি চেম্বার। বাকি দুটি চট্টগ্রাম শহরে। চেম্বারের তালিকায় রয়েছে টেকনাফের ইনোভা হেলথ কেয়ার, টেকনাফ মেডিকেল সেন্টার ও কেয়ার ল্যাব; উখিয়ার কোর্টবাজার ডিজিটাল হাসপাতাল; পেকুয়ার নূর হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার; মহেশখালীর নিউরন হেলথ; এ ছাড়া কক্সবাজার শহরের জেনারেল হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতাল, জমজম হাসপাতাল, পপুলার ডায়াগনস্টিক হাসপাতাল ও অলিম্পাস হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া মহেশখালীর উত্তরা ফার্মেসি ও নাহার ফার্মেসিতেও তার চেম্বার করার তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ( ঢামেক ) থেকে ১০ মাস আগে বদলি হলেও এখনো তিনি ওই হাসাপতালের চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। তার সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক, পত্রিকায় প্রচারিত চেম্বারের বিজ্ঞপ্তি, তার প্রেসক্রিপশন এবং চেম্বারের সাইনবোর্ডেও ঢামেকের চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় ঝুলছে।

কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে চেম্বার করার বিষয়ে ডা. শামসুল বলেন, আমি অফিসের সময়ে চেম্বার করি না। আমি বেলা দুইটা থেকে চেম্বার করি। মাসে দুইদিন করে পেকুয়া, মহেশখালী, উখিয়া, টেকনাফ ও চকরিয়ায় রোগী দেখি। এ ছাড়া চট্টগ্রামেও আমি মাসে দুইদিন চেম্বার করি। বাকি সময় আমি কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন চেম্বারে বসি। তার সেবাগ্রহীতা ও চেম্বারের সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চেম্বার ভেদে তিনি সর্বনিম্ন ১ হাজার থেকে সর্ব্বোচ্চ ২ হাজার টাকা ফি নেন। তবে তার জন্মস্থান মহেশখালীর কালারমারছড়া ইউনিয়নের মিজ্জিরপাড়ায় চেম্বারে রোগী দেখতে ৫০০ টাকা নেন।

কক্সবাজারে বদলির জন্য মরিয়া : ডা. শামসুলের ঘনিষ্ঠজনরা জানান, তিনি প্রাইভেটে রোগী দেখার জন্যই কক্সবাজারে আসতে চান। এ কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ, এমপি ও মন্ত্রীদের কাছে জোর তদবির চালাচ্ছেন। ডা. শামসুল বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষ, মহেশখালী-কুতুবদিয়ার এমপি মাহফুজ উল্লাহ আলমগীর ফরিদ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা আমাকে কথা দিয়েছেন, দেশের অবস্থা আরেকটু ভাল হলেই আমাকে বদলির ব্যবস্থা করবেন। আমি সেই আশাতেই আছি।

তবে মহেশখালী-কুতুবদিয়ার সংসদ সদস্য মাহফুজ উল্লাহ আলমগীর ফরিদ বলেন, আমি স্বাস্থ্যমন্ত্রী নই। কাজেই আমার সুপারিশের প্রশ্নই আসে না। আর আমি এই বিষয়ে কিছুই জানি না। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিব মু. হাসনাত মোর্শেদ ভূঁইয়া বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন কোনো সুপারিশ করেননি।