নেপালে বন্যায় নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়াল নিখোঁজ ৪৪৬২

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে এক হাজার তিনজনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপালে ৯৮৭ জন এবং তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষের বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি গতকাল মঙ্গলবার জানিয়েছে, বন্যায় নিখোঁজ ব্যক্তির সংখ্যা কিছুটা কমে তিন হাজার ৯১৬ জনে নেমেছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতে নিখোঁজ রয়েছেন ৫৪৬ জন। দুই অঞ্চল মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৪৬২ জনে। নেপালে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকেপড়া কয়েকশ কর্মী ঘিরে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। দেশটিতে ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের পর জলবায়ু নিয়ে কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ।

চীন, ভারত ও নেপালের বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দলগুলো দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করেছে এবং হিমালয়ের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষ মঙ্গলবার জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া কয়েকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে এখনো অন্তত ৬৩৯ মানুষ আটকে রয়েছেন, যা বর্তমানে উদ্ধার অভিযানের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলজুড়ে ১১ হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ৯ হাজার ২০০ জনের বেশি কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। তারা আহত মানুষকে অনুসন্ধান ও উদ্ধার, মরদেহ ব্যবস্থাপনা, অবরুদ্ধ সড়ক মুক্ত করা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কাজ সমন্বয় করছেন।

নেপালে আকস্মিক বন্যা-ভূমিধসের সঠিক কারণ এখনো স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন, তিব্বত-নেপাল সীমান্তে হিমবাহধস থেকে সৃষ্ট বরফশীতল পানি ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল ঢল এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই দুর্যোগের সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার রাতে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে শাহ বলেন, রাসুয়ার ভোতেকোশি নদীতে আসা ঢল কোনো সাধারণ বন্যা ছিল না। হিমালয় অঞ্চলে তুষার ও বরফের বিশাল ধসের কারণে এটি ঘটেছে। এটি ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম বড় দুর্যোগ। তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে হিমালয় অঞ্চলে আমরা যেসব ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছি, সেগুলোও বাড়ছে। তাই এ অঞ্চলকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।’

প্রায় তিন কোটি মানুষের দেশ নেপাল মূলত গ্রামীণ অর্থনীতিনির্ভর। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনে দেশটির দায় খুব সামান্যই। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের বিপজ্জনক পরিণতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে নেপালকে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেপালের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরার কথা উল্লেখ করে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনে আমরা যেসব দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছি, সে বিষয় এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জোরালোভাবে তুলে ধরার সময় এসেছে।’ গত বুধবারের এ দুর্যোগের পর জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিল এক বিবৃতিতে বলেন, হঠাৎ হিমবাহধস ও আকস্মিক বন্যা এই পার্বত্য পরিবেশগুলোর ভঙ্গুর অবস্থাকে সবার সামনে উন্মোচন করেছে।

হিমালয় ও হিন্দুকুশ পর্বতমালার হিমবাহগুলো পার্বত্যাঞ্চলের প্রায় ২৪ কোটি মানুষের পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এ ছাড়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিচের দিকের নদী উপত্যকাগুলোতে বসবাসকারী আরও প্রায় ১৬৫ কোটি মানুষও এই পানির ওপর নির্ভরশীল। ২০২৩ সালে নেপাল সফরের সময় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছিলেন, দ্রুত হিমবাহ গলে যাওয়ার কারণে হিমালয় অঞ্চল কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে এবং ‘বিশ্বের ছাদগুলো একে একে ধসে পড়ছে’।

নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে ৩৯ দেশের ৫৮৩ বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তিব্বতে নিখোঁজ ৫৪৬ জনের মধ্যে ২৩ দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের বড় একটি অংশ ভারতের নাগরিক। নয়াদিল্লির তথ্যানুযায়ী, ভারতের ২৭৫ নাগরিক এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত আরও ১২৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ভারতের উত্তর প্রদেশের কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপাল থেকে নেমে আসা নদ-নদী থেকে তারা ১৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, বন্যার কবলে পড়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধার করা মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছে ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষ। তাদের এখনো মৃতের সংখ্যার হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।