পরীক্ষার ফি দিতেই কেটে যায় ৪ দিন, ঘুরতে হয় ৬ দপ্তর

দুই সপ্তাহ পর পরীক্ষা শুরু। এখন পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করব নাকি ফরম ফিলাপ করার জন্য বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরব? আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী এমিল ইসলাম শাহীন। তার পরীক্ষা শুরু আগামী ৭ সেপ্টেম্বর। পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ ও নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার জন্য তাকে ঘুরতে হয়েছে ছয়টি দপ্তরে। প্রতিটি ধাপে ফরমে স্বাক্ষর নেওয়া ও ফি জমা দিতে সময় লেগেছে কয়েকদিন। শুধু শাহীন নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পরীক্ষার ফি পরিশোধ ও ফরম পূরণের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তাদেরও একই জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একাধিক দপ্তরে ঘুরে, স্বাক্ষরের জন্য অপেক্ষা করে এবং ব্যাংকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ফি জমা দেওয়ার পরই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমতি মেলে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন বিভাগের বর্ষ ও সেমিস্টার পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে শিক্ষার্থীদের প্রথমে নিজ নিজ বরাদ্দকৃত (অ্যালোটেড) হল থেকে একটি ফরম সংগ্রহ করতে হয়। এরপর তা পূরণ করে বিভাগে সভাপতির স্বাক্ষরের জন্য জমা দিতে হয়। স্বাক্ষর হলে সেটি আবার হল কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে প্রাধ্যক্ষের স্বাক্ষর নিতে হয়। প্রাধ্যক্ষের স্বাক্ষরের পর পরীক্ষার ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ফি জমা দিতে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রণী ব্যাংক শাখায় যেতে হয়। সেখানে ফি জমা দিয়ে রশিদ নিয়ে যেতে হয় প্রশাসনিক ভবনে। প্রশাসনিক কর্মকর্তার স্বাক্ষরের পর সবশেষে ফরম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে জমা দিতে হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করতে ছয়টি দপ্তরে অন্তত তিন থেকে পাঁচ দিন ঘুরতে হয়। ফরম পূরণ করে স্বাক্ষরের জন্য বিভাগে জমা দিলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একই দিনে স্বাক্ষরিত ফরম পাওয়া যায় না। আবার হলের প্রাধ্যক্ষকে নিয়মিত কার্যালয়ে না পাওয়ায় স্বাক্ষরের জন্য আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হয়। ব্যাংকে ফি জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় শিক্ষার্থীদের।

শাহীন বলেন, ‘একটি পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য এতগুলো দপ্তরে ঘোরাঘুরিটা ভোগান্তির। পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে করা হলে শিক্ষার্থীদের সময় ও শ্রম দুটোই বাঁচত।’

শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সেবা এখনো অ্যানালগ পদ্ধতিতে পরিচালিত হওয়ায় তাদের এমন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার ফরম পূরণ ও ফি পরিশোধসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সেবা অটোমেশনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে এলেও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সেবা দ্রুত অটোমেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো অটোমেশনের আওতায় এলে শিক্ষার্থীদের আর দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হবে না। এ বিষয়ে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৫৩তম আবর্তনের শিক্ষার্থী নাঈম ইসলাম তার ভোগান্তির কথা তুলে ধরে বলেন, ‘পরীক্ষার আগে যে সময়টায় পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার কথা, সেই সময়টুকু এভাবে প্রশাসনিক কাজের পেছনে ব্যয় করা অত্যন্ত হতাশাজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সেবায় অটোমেশনের কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হলেও এর কোনো বাস্তব প্রতিফলন আমরা এখনো দেখতে পাচ্ছি না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ে অটোমেশন চালুর দাবিতে ছাত্রসংগঠনগুলোর আন্দোলন নতুন নয়। ২০১৮ সাল থেকেই বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নসহ প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম আধুনিকায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। ২০২৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করে। সে সময় কমিটিকে একটি বাস্তবমুখী, টেকসই ও গতিশীল কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) তৈরি করে তা গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে জাতীয় ছাত্রশক্তির জাবি শাখার সভাপতি জিয়া উদ্দিন আয়ান বলেন, ‘দীর্ঘদিনেও সেই কমিটি কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। শুধু গ্রন্থাগারকে নামমাত্র অটোমেশনের আওতায় আনা হলেও সেখানেও সব সুবিধা এখনো শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। পরীক্ষা, রেজিস্ট্রার দপ্তর, পরিবহনব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের ইউনিক প্রোফাইল বা আইডি চালুর ক্ষেত্রেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

তবে কাজের ধীরগতির বিষয়টি স্বীকার করলেও অটোমেশনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে দাবি করেছেন জাকসুর তথ্যপ্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক মো. রাশেদুল ইসলাম লিখন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা আশা করছি, ৫৫তম ব্যাচ ও নতুন মাস্টার্স শিক্ষার্থীদের ভর্তির মাধ্যমেই অনলাইনে এন্ট্রি ও রেজাল্ট-ফরম পূরণসহ পুরো অটোমেশন ব্যবস্থা কার্যকর হবে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ও অটোমেশন কমিটির অধ্যাপক ড. আবু সায়েদ মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অটোমেশনের কাজ নিয়ে কমিটি হিসেবে কাজ করছি। অটোমেশনের কাজ একদম শেষ দিকে। আমাদের দিক থেকে কাজ শেষ করে ফাইলটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপাচার্যের দপ্তরে পাঠিয়েছি।’

কোন প্রতিষ্ঠানকে এই কাজ দেওয়া হবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথম ধাপে আমরা অনেকগুলো কোম্পানি নিয়ে কাজ শুরু করি। সেখান থেকে তাদের অভিজ্ঞতা, রেপুটেশন ও কাজের মান যাচাই-বাছাই করে প্রথমে আটটি এবং পরে তিনটি কোম্পানিকে শর্টলিস্ট করে নিয়ে আসি এবং প্রশাসনকে তিনটি কোম্পানির নামই জমা দিয়েছি। এখন আর্থিক বিষয় থেকে শুরু করে সার্বিক দিক বিবেচনা করে প্রশাসন যাকে ভালো মনে করবে, তাকেই দায়িত্বটা দেবে। তাই এ নিয়ে আর খুব বেশি দীর্ঘসূত্রতা হওয়ার সুযোগ নেই।’

এই কাজে এত দীর্ঘ সময় লাগার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি, আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট ছোট আলাদা সফটওয়্যার ব্যবহার করা হতো, যেমন ভর্তি বা মাইগ্রেশন সিস্টেমে। কিন্তু একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো সংযোগ ছিল না। আমরা চেয়েছিলাম এমন একটা মাস্টারপ্ল্যান বা ডিজাইন তৈরি করতে, যাতে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় একটা সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আসে।’

তিনি বলেন, প্রক্টর অফিসকেও এ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কারণ কোনো শিক্ষার্থীকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে শাস্তি দেওয়া হলে সেই তথ্য অনেক সময় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে পৌঁছায় না। ফলে শাস্তির যথাযথ বাস্তবায়নেও সমস্যা দেখা দেয়। এমনও হতে পারে, কোনো শিক্ষার্থী ছয় মাসের জন্য বহিষ্কৃত হলেও তথ্য সমন্বয়ের অভাবে তিনি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন। এ ধরনের সমস্যা দূর করতেই প্রক্টর অফিসকে অটোমেশন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার, পরিবহন অফিস, সাইবার বুলিং সেল, অ্যান্টি-র‌্যাগিং সেল এবং ছাত্র-শিক্ষণ কেন্দ্রসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরকেও এ ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। মূলত পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেম তৈরি করাই এই অটোমেশনের লক্ষ্য।

তিনি বলেন, শুরুতে পরিকল্পিত অর্থায়ন পেতেও সময় লেগেছে। অটোমেশন সেলের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বিভিন্ন তহবিলের জন্য আবেদন করা হয়েছিল। তবে ইউজিসি সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের জন্য অর্থায়ন না করায় বিকল্পভাবে অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করতে হয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি অটোমেশনের কাজ মূল অটোমেশন প্রকল্প থেকে পৃথকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, লাইব্রেরি অটোমেশন প্রকল্পের অর্থায়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাজেট থেকে নয়, সরাসরি ইউজিসি থেকে আনা হয়েছে। উপাচার্য তাকে এ প্রকল্পের দায়িত্ব দিয়েছেন এবং তিনি নিজেই এর পুরো কার্যক্রম তদারকি ও উন্নয়নের কাজ পরিচালনা করছেন।

লাইব্রেরি অটোমেশনের অগ্রগতি নিয়ে তিনি বলেন, খুব দ্রুতই এর দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে। প্রয়োজনীয় অনেক যন্ত্রপাতি ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে। এগুলোর সংযোগ ও স্থাপন সম্পন্ন হলেই কাজটি দৃশ্যমান হবে। আরও কিছু যন্ত্রপাতিও আনা হচ্ছে। আশা করছি, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে লাইব্রেরি অটোমেশনের কাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সেমিনার লাইব্রেরিকেও একটি সমন্বিত ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ কাজও চলমান এবং খুব দ্রুতই এসব কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অটোমেশন প্রকল্পের কাজ এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই এর কার্যক্রম শুরু করা হবে। এ বিষয়ে চলতি সপ্তাহে উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠক করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বর্তমানে মূলত কোন কোম্পানিকে অটোমেশনের কাজের দায়িত্ব দেওয়া হবে, সে বিষয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলেই দ্রুত কার্যক্রম শুরু হবে।