দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টমস হাউসে রাজস্ব ফাঁকি ও মিথ্যা ঘোষণা ঠেকাতে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। সন্দেহজনক পণ্যচালান শতভাগ পরীক্ষা, বিশেষ অভিযান এবং অতিরিক্ত পণ্য শনাক্তের পাশাপাশি আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কাস্টমসের আইআরএম টিমের কঠোর নজরদারির কারণে কোনো কোনো পণ্যচালান পরীক্ষা ও খালাসের পুরো প্রক্রিয়ায় তিন থেকে চার দিন পর্যন্ত সময় লাগছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, রাজস্ব ফাঁকি বন্ধের পাশাপাশি বৈধ আমদানিকারকেরা যাতে অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, হাতে গোনা দু-একজন হলুদ সাংবাদিকের কারণে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। কাস্টমস কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জোর করে চাঁদা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে নাম না জানা দু-একটি পত্রিকা ও ফেসবুকে কর্মকর্তাদের জড়িয়ে মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে কর্তৃপক্ষ।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই কোনো কোনো পণ্যচালানের পরীক্ষা কার্যক্রম তিন থেকে চার দিন ধরে সম্পন্ন করতে হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা অনুসরণ করে দ্রুত পণ্য খালাসের ইচ্ছা থাকলেও এসব কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
বৈধ পণ্যচালান দ্রুত খালাস নিশ্চিত করার পাশাপাশি অসাধু ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকির অপচেষ্টা ঠেকাতে কাস্টমস হাউস বেনাপোল নিয়মিত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সম্প্রতি বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান, জয়েন্ট কমিশনার মো. শরফুদ্দিন মিঞা এবং আইআরএম টিমের দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার তওফিকুর রহমানের নেতৃত্বে নিবিড় তদারকি, গোয়েন্দা তৎপরতা ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
কাস্টমস সূত্র জানায়, গত তিন মাসে আইআরএম টিমের নজরদারিতে বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব উদ্ধার হয়েছে। একই সঙ্গে আমদানি করা বিভিন্ন পণ্যের চালানে জালিয়াতি ও গুরুতর অনিয়মও শনাক্ত হয়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে বেনাপোল কাস্টমস হাউসে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়। এ সময় বিভিন্ন অভিযানে মিথ্যা ঘোষণা ও ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানির ১৪টি চালান আটক করা হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৩০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে কাস্টমস সূত্র।
রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে চারটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সও স্থগিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো লিংক ইন্টারন্যাশনাল, রয়েল এন্টারপ্রাইজ, করিম অ্যান্ড সন্স ও হুদা ইন্টারন্যাশনাল।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, বন্ডের কাগজ, গার্মেন্টস ও কেমিক্যালজাতীয় পণ্যের চালানে তুলনামূলকভাবে অনিয়মের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
বেনাপোল কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান বনি বলেন, কাস্টমসের আইআরএম টিম যেসব পণ্যচালান পরীক্ষা করে, সেগুলো শতভাগ কায়িক পরীক্ষার পর খালাস দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ করেন, যশোর শহরের একজন ভারতীয় ‘র’ এজেন্ট ও হলুদ সম্পাদক নিয়মিত বেনাপোলে এসে কাস্টমস ও বন্দর কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জোর করে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করেন। চাঁদা না দিলে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট খবর প্রকাশ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে কড়াকড়ি বাড়ার প্রভাব পড়েছে বেনাপোল দিয়ে পণ্য আমদানিতেও। কাস্টমসের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেনাপোল দিয়ে ১৫ লাখ ৯১ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছিল। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ পরিমাণ ১ লাখ ২৯ হাজার ৭৯ মেট্রিক টন কম।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। বছর শেষে আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। একই সময়ে বেনাপোল দিয়ে আমদানিও প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার মেট্রিক টন কমেছে।
আমদানি ও রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতির পরও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের জন্য ১০ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগের অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা ৭০২ কোটি টাকা কম।
তবে গত অর্থবছরে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হওয়ায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪ হাজার ২৯ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার ফাইজুর রহমান জানিয়েছেন, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়া হয়েছে। সন্দেহজনক চালান শতভাগ পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কোনো কর্মকর্তা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।