জননিরাপত্তা

আত্মতুষ্টি নয়, কাজ দেখতে চাই

এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বারবার তাগিদ দিয়ে আসছি, জননিরাপত্তা কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নয়নে আর কোনো কথা নয়, কাজ দেখতে চাই। কিন্তু ২ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরের শীর্ষ ও পার্শ্ব প্রতিবেদনে ফের যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে সংগতই প্রশ্ন দাঁড়ায় নিরাপত্তাহীনতা কি মানুষের পিছু পিছু আতঙ্কের ছায়ার পরিসর ক্রমেই বাড়াচ্ছে? ‘ভোরের রাজধানী ভয়ংকর’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনের গর্ভে যা রয়েছে তাতে প্রতীয়মান হচ্ছে, শুধু লঞ্চ-বাস টার্মিনালই নয়, দুর্বৃত্তরা ওঁৎ পেতে আছে প্রায় সর্বত্র। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে ওদের সক্রিয়তা। আবার দিনের শুরুতে ভোরে ওরা দাপিয়ে বেড়ায় রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তায়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে অতি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো উল্লেখের পাশাপাশি দুর্বৃত্তদের সংখ্যাচিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা গুরুত্বের সঙ্গে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে সংশ্লিষ্টদের অবগতও করেছেন, যেসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে সেখানকার কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি তাৎক্ষণিক বদলিসহ সাময়িক বরখাস্তও করা হবে। তারা এও নিশ্চিত হয়েছেন, এলাকায় পুলিশের ঢিলেঢালা টহল হচ্ছে। রাতের বেলায় ডিউটি হয় না বললেই চলে। আবার কিছু টহল হলেও গাড়ির মধ্যে ঘুমিয়ে রাত পার করেন দায়িত্বরতরা!

‘যাত্রী নিরাপত্তায় একগুচ্ছ পরিকল্পনা’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহাসড়ককেন্দ্রিক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনার কথা। সেক্ষেত্রেও রাতের বেলায় পুলিশের টহলে গাফিলতির চিত্র উঠে এসেছে। হাইওয়ে থানার সংখ্যা কম থাকায় ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন মহাসড়কে প্রায়ই দুর্বৃত্তদের মহাসড়ক-যাত্রীদের ওপর হামলে পড়ার ঘটনা ঘটছে। এমন বাস্তবতায় যাত্রীদের নিরাপত্তায় মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে ৭০টি থানা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ, এও জানা গেছে ওই প্রতিবেদনেই। শুধু তা-ই নয়, নিত্য যাতায়াতকারী হাজার হাজার মানুষের এই মাধ্যমটি থেকে আতঙ্কে ছায়া সরাতে এআই ক্যামেরা স্থাপনসহ আরও কিছু পরিকল্পনার সিদ্ধান্তও হয়েছে। বার্তাগুলো বিদ্যমান আতঙ্কের মধ্যে কিছুটা স্বস্তির হলেও এর পাশাপাশি আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতাও দাঁড়ায় সমান্তরালে । আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিকল্পে প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সরকারের সমঅঙ্গীকারের অনেক কথাই আমরা শুনেছি। উচ্চারিত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ও বিদ্যমান বাস্তবতার মধ্যে যখন অসামঞ্জস্যের দাগ মোটা হয়ে উঠে তখন মানুষের বোধে অসহায়ত্ব তো বটেই, প্রশ্নের পর প্রশ্ন কাতারবদ্ধ হতে থাকে। দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ‘মব’সহ বহুমাত্রিক অপরাধ মানুষের মধ্যে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। তখন দৃঢ়তার সঙ্গে আজকের ক্ষমতাসীনরা শুধু প্রতিবাদই জানাননি, প্রতিবিধানের দাবিতেও ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। বিএনপি নেতৃত্বাধীন এ সরকারের অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের বিষয়টি ছিল অন্যতম। কিন্তু অপ্রীতিকর হলেও সত্য, দৃশ্যমান উন্নতি তো হয়ইনি; কোনো কোনো ক্ষেত্রে আতঙ্ক-শঙ্কার পারদ ক্রমেই হচ্ছে ঊর্ধ্বমুখী। সরকারের দায়িত্বশীল কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘সন্তোষজনক’ বলে আত্মতুষ্টি প্রকাশ করেছেন! কিন্তু জাতীয় সংসদে দলীয় অনেক সদস্যই এ নিয়ে উল্টো ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর দায়িত্বশীলসহ সরকারের দায়ভুক্তের মধ্যে অগ্রগণ্য হলো নিরাপত্তা, স্থিতিশীল সমাজব্যবস্থা নিশ্চিতকরণসহ মানুষের অধিকারের ক্ষেত্রগুলো নিষ্কণ্টক করা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে বিশেষ করে পুলিশের ভূমিকা ও দায় সর্বাধিক। কিন্তু আমরা জানি, দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে পুলিশের ওপর যে অভিঘাত লাগে এর বিরূপ প্রভাব বহুমুখী হয়ে ওঠে। আমরা মনে করি, পুলিশের পেশাদারত্ব-দক্ষতা-কর্মকৌশল ইত্যাদি বিষয়ে মনোযোগ গভীর করার পাশাপাশি জনবল, যানবাহন সংকটসহ আনুষঙ্গিক সব কিছু নিষ্কণ্টক করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার জবাবদিহি-দায়বদ্ধতার পাঠও পুষ্ট করার ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের আইন, পরিকল্পনা ইত্যাদি কোনো কিছুরই কমতি নেই, কিন্তু যথাযথভাবে প্রয়োগ বা বাস্তবায়নে যে গলদ অনেক আছে, নতুন করে এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নি®প্রয়োজন। জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন না হলে মানবাধিকারও বিপন্ন হয়, তা মনে রাখা বাঞ্ছনীয়। আইনের শাসন-ন্যায়বিচার-মানবাধিকারের ঔজ্জ্বল্যই রাষ্ট্র-সমাজ ও মানুষের জীবনের রক্ষাকবচ। আমরা আশা করি, জনগুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে আর কোনো কথার ফুলঝুরি নয়, কাজের কাজ দৃশ্যমান হবে। দুর্বৃত্তদের নিষ্কৃতি নেই, এই অঙ্গীকার কথার অলংকার নয়, বাস্তবতায় এর প্রতিফলন আমরা দেখতে চাই।