সৌদি আরবের মালিকানাধীন একটি তেলবাহী জাহাজে ইরানের হামলায় দুই ফিলিপাইন নাবিক নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে রিয়াদ। সোমবার রাতে হরমুজ প্রণালিতে ‘সিদর’ নামের সুপারট্যাংকারে হামলার ঘটনাকে কঠোরভাবে নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব। খবর বিবিসি।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের জাতীয় নৌপরিবহন কোম্পানি বাহরি বুধবার নিশ্চিত করেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের জাহাজ ‘সিদর’ একটি ‘নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনায়’ জড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় দুই ফিলিপাইন নাবিক নিহত হন।
বাহরি জানায়, সোমবার স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে হরমুজ প্রণালিতে ঘটনাটি ঘটে। এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ঘটনায় তাদের দুই ফিলিপাইন নাবিকের মৃত্যুতে তারা গভীরভাবে শোকাহত। নিহতদের পরিবারের সদস্য, স্বজন ও সহকর্মীদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে কোম্পানিটি।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরে অভিযোগ করে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় ইরান সৌদি মালিকানাধীন ‘সিদর’ ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতেও সাম্প্রতিক ইরানি হামলার নিন্দা জানায় রিয়াদ।
হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে উত্তেজনা কমানো ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে সৌদি আরব।
মেরিটাইম নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান মারিস্কস ও কেপলার জানিয়েছে, সোমবার রাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল বহন করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দুটি ট্যাংকারে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল করে সৌদি অপরিশোধিত তেল ছিল।
মারিস্কসের তথ্য অনুযায়ী, ‘সিদর’ ওমানের খাসাবের প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার মালিকানাধীন ‘সেনেগাল প্রসপারিটি’ নামের আরেকটি সুপারট্যাংকারও খাসাবের পূর্বে তিনটি অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে আক্রান্ত হয় বলে জানানো হয়েছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সংস্থাও একই এলাকায় দুটি ঘটনার কথা জানিয়েছে।
তবে সৌদি আরবের অভিযোগের বিষয়ে ইরান এখনো কোনো সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এর আগে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছিল, দুটি তেলবাহী জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর তাগিদে হরমুজ প্রণালির একটি ‘অবৈধ’ পথ ব্যবহার করছিল। এ সময় জাহাজ দুটি মাইনে আঘাত করে এবং বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায় বলে দাবি করে আইআরজিসি।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করেনি। তবে তারা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং মার্কিন সেনাদের ওপর আইআরজিসির সাম্প্রতিক হামলার চেষ্টার পর ইরানে নতুন করে হামলা চালানো হয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাতের মধ্যেই হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। সংঘাত শুরুর পর ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে প্রণালিটির কার্যক্রম কার্যত ব্যাহত হয়ে পড়ে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুনে যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছিল। তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই সমঝোতা ভেস্তে যায়। এরপর বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি হামলা পুনরায় শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রও অবরোধ পুনর্বহাল করে।
ইরান অবশ্য হরমুজ প্রণালির ওপর কোনো না কোনো মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অবস্থানে রয়েছে। দেশটি এমন জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, যেগুলো ইরানের জলসীমার পরিবর্তে ওমানের জলসীমা দিয়ে অপেক্ষাকৃত দক্ষিণের পথ ব্যবহার করছে।
এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, হরমুজ প্রণালি ‘খোলা’ রয়েছে। দক্ষিণের পথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে মার্কিন সামরিক বাহিনী সহায়তা করছে বলেও জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজে করে ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর এক দিনে সর্বোচ্চ পরিমাণ।