রোগীর মৃত্যু ঘিরে হাসপাতালে তান্ডব, ১৭ চিকিৎসক আহত

রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে শজিমেক হাসপাতালের সপ্তম তলার মেডিসিন ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় ১৭ জন চিকিৎসক আহত হওয়ার অভিযোগ করেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। গতকাল বুধবার দুপুরে হামলার প্রতিবাদে এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ঘোষণা করেছেন তারা। চিকিৎসকদের ওপর হামলা, হত্যাচেষ্টা, সরকারি কাজে বাধা, ভাঙচুর ও চুরির অভিযোগে সাতজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৮ থেকে ১০ জনের বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলার পর ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে বিকেলে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ।

রোগীর মৃত্যুর পর সংঘর্ষ : মামলার এজাহার ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বগুড়া সদর উপজেলার রাজাপুর গ্রামের মো. আব্দুল মালেক (৫০) অ্যাজমা জটিলতা, তীব্র শ্বাসকষ্ট ও শক নিয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে শজিমেক হাসপাতালের সপ্তম তলার মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হন। রাত ১০টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকদের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে চিকিৎসকদের দাবি, সর্বাত্মক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পরও রোগীর মৃত্যু হলে স্বজন ও তাদের সঙ্গে থাকা কয়েকজন বহিরাগত চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালান।

এজাহারে বলা হয়, রাত সাড়ে ১০টার দিকে আসামিরা অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে মেডিসিন ওয়ার্ডে প্রবেশ করে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালান এবং সরকারি কাজে বাধা দেন। হামলার সময় ইন্টার্ন চিকিৎসক আজরফ ইসলামকে ধারালো চাকু দিয়ে পিঠে আঘাত এবং লোহার বেড স্ট্যান্ড দিয়ে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়েছে। লোহার স্ট্যান্ডের পিটুনিতে ইন্টার্ন চিকিৎসক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও সাইফুলের হাত ভেঙে গেছে, বুকে পিঠে আঘাত পেয়েছেন ফয়সাল ভূঁইয়া, নিলাদ্রি শেখর দত্তসহ ১৭ জন। হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মনজুর-এ-মোর্শেদও জানিয়েছেন, ছয়জন চিকিৎসক জখম হয়েছেন।

ভাঙচুর ও চুরির অভিযোগ : মামলার এজাহার অনুযায়ী, হামলার সময় তিনটি স্মার্টফোন ও একটি স্টেথোস্কোপ চুরি করা হয়। এসব সামগ্রীর আনুমানিক মূল্য ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। একই সঙ্গে মেডিসিন ওয়ার্ডের সরকারি মালামাল ভাঙচুর করে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার টাকার ক্ষতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনার পর হাসপাতালে অবস্থানরত রোগীর স্বজন ও উপস্থিত লোকজন কয়েকজনকে আটক করেন। পরে খবর পেয়ে ছিলিমপুর পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা হাসপাতালে গিয়ে তাদের হেফাজতে নেন।

চার দফা দাবি, অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি : হামলার প্রতিবাদে গতকাল বুধবার দুপুরে কলেজ প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলন করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। সেখানে ডা. রিতুল ম-ল স্নিগ্ধ চার দফা দাবি তুলে ধরেন। তাদের দাবিগুলো হলো হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ ও মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা; দেশের প্রতিটি হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে ‘আর্মড আনসার’ বা সমমানের নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করা; প্রয়োজনীয় লোকবল বৃদ্ধি ছাড়া ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি বন্ধ করা এবং হাসপাতালের শয্যাসংখ্যার সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশের বেশি অতিরিক্ত রোগী ভর্তি না করা এবং হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে একাধিক স্বজন বা দর্শনার্থীর অবস্থান নিষিদ্ধ করা।

চিকিৎসক প্রতিনিধি ডা. জেরিন ও ডা. রিদোয়ান উদ্দিন জানান, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে।

ব্যাহত চিকিৎসাসেবা, ভোগান্তিতে রোগী : ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আকস্মিক কর্মবিরতির কারণে শজিমেক হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোর চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এতে চিকিৎসা নিতে আসা শত শত রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

চিকিৎসাধীন ঝরনা বেগম ও নিতাই জানান, ঘটনার পর থেকেই হাসপাতালে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা সেবা বন্ধ রাখায় এবং নিয়মিত ফাইল না দেখায় রোগীদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

তবে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মনজুর-এ-মোর্শেদ জানান, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির মধ্যেও জ্যেষ্ঠ ও মিড-লেভেলের চিকিৎসকদের দিয়ে জরুরি সেবা চালু রাখা হয়েছে। অবকাঠামো ও জনবলের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সংকট মোকাবিলায় জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ও প্রশাসন নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে।

মামলা ও গ্রেপ্তার : গতকাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষে ওয়ার্ড মাস্টার মো. আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় মামলা করেন। মামলায় মো. মনির, মো. নাফিউল, প্রান্ত, এসএম সিহাব, মো. রাকিবুল হাসান, মো. তানবিন শেখ ও মো. বিপ্লব সরদারকে আসামি করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে অজ্ঞাত আরও ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

বগুড়া সদর থানা পুলিশ জানায়, মামলার পর ছয় আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলো তানবিন, রাকিবুল, নাফিউল, প্রান্ত, বিপ্লব ও এমএম মিনহাজ। বিকেলে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহিম আলী গতকাল জানান, ঘটনার পর পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং জড়িতদের হেফাজতে নেয়। অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।