টাকার বন্যায় দলবদল

ইউরোপিয়ান ফুটবলের দলবদলের বাজার মানেই যেন বিত্তবৈভবের রাজকীয় মহাযুদ্ধ। আর এ খেলায় বরাবরের মতো এবারও বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ। গ্রীষ্মকালে দলবদলের উইন্ডো বন্ধ হওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত ক্লাবগুলোর কোটি কোটি পাউন্ড ওড়ানোর হিড়িক সব সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। সম্মিলিতভাবে এবারের গ্রীষ্মকালে দলবদলে ক্লাবগুলোর মোট খরচ গিয়ে ঠেকেছে চোখ কপালে তোলার মতো ৩.৪৬ বিলিয়ন বা প্রায় ৩৫০ কোটি পাউন্ডে!

মাত্র পাঁচ বছর আগেও লিগটির সম্মিলিত খরচ যেখানে সাকল্যে ছিল ১.১৩ বিলিয়ন পাউন্ড, সেখানে গত বছরের ৩.১৪ বিলিয়ন পাউন্ডের রেকর্ডও এবার ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। বিশ্ব ফুটবলের বাজারদর এবং রদবদল কীভাবে নিজেদের পকেটের জোরে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, অর্থের থলে খুলে ইংলিশ ক্লাবগুলো তা আরও একবার হাড়ে হাড়ে প্রমাণ করল।

এই রেকর্ড ভাঙা আর্থিক উৎসবের চূড়ায় অবস্থান করছে ম্যানচেস্টার সিটি। তারা কেবল দলবদলের শেষ দিনে চেলসি থেকে আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজকে যৌথ ব্রিটিশ রেকর্ড গড়ে ১২৫ মিলিয়ন পাউন্ডে উড়িয়ে আনেনি, বরং সব মিলিয়ে এক উইন্ডোতেই পকেট থেকে খরচ করেছে রেকর্ড ৪৫৮ মিলিয়ন পাউন্ড। যার মধ্যে আরেক শতকোটির ডিলে নটিংহাম ফরেস্ট থেকে ইলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ১১৬ মিলিয়ন পাউন্ডে এনেছেন সিটিজেনরা। কেবল ম্যানসিটিই একা নয়, শতকোটি পাউন্ড বা তার বেশি মূল্যের মেগা ট্রান্সফারের হিড়িক লেগেছিল লিগের অন্যান্য জায়ান্টের মধ্যেও। চেলসি মরগান রজার্সকে কিনেছে ১১৭ মিলিয়ন পাউন্ডে। একইভাবে লিভারপুল ও টটেনহ্যামও বড় অঙ্কের অর্থে নিজেদের স্কোয়াড সমৃদ্ধ করেছে।

এদিকে ইংলিশ ক্লাবগুলোর এই আকাশচুম্বী খরচের বাইরে ইউরোপের অন্যান্য শীর্ষ লিগের পরাশক্তি ক্লাবগুলোও বসে থাকেনি। স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ নিজেদের স্কোয়াড পুনর্গঠনে ইয়ান দিওমান্দে, মার্ক কুকুরেয়া এবং কার্লোস এসপিদের দলে টানতে খরচ করেছে প্রায় ১৯৩ মিলিয়ন পাউন্ড। তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনাও পিছিয়ে থাকেনি; রদ্রি ও জেসুসদের মতো তারকাদের ক্যাম্প ন্যুতে আনতে তাদের পকেট থেকে গেছে প্রায় ১৮২ মিলিয়ন পাউন্ড। অন্যদিকে  জার্মান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখ কিছুটা বুঝেশুনে খরচ করলেও দলবদলে তাদের বিনিয়োগ ছিল ৯২ মিলিয়ন পাউন্ডের মতো। ফরাসি ক্লাব পিএসজিও আকলিউশ ও ফেররান তোরেসদের মতো বিশ্বজয়ীদের ভেড়াতে খরচ করেছে প্রায় ১৩০.৫ মিলিয়ন পাউন্ড, যা ইউরোপের অন্য লিগগুলোতেও দলবদলের বাজারকে বেশ জমজমাট করে তুলেছিল।

তবে আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, এবারের এই বিশাল বাজেটের একটি বড় অংশজুড়েই রয়েছে ইংলিশ ক্লাবগুলোর নিজেদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ লেনদেন। বিদেশি লিগ থেকে চড়া দামে তারকা এনে মাঠে ফ্লপ হওয়ার ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে প্রিমিয়ার লিগের চেনা পরিবেশে আগে থেকেই প্রমাণিত ও পরীক্ষিত খেলোয়াড়দের ওপর আস্থা রাখতেই ক্লাবগুলো বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছে। এ ছাড়া অপ্রয়োজনীয়ভাবে দাম বাড়িয়ে নেওয়ার চেয়ে নিজেদের ফুটবলারদের স্কোয়াডে ধরে রাখা অনেক বেশি নিরাপদ বলে মনে করেছেন দলগুলোর কর্তাব্যক্তিরা। সবচেয়ে বড় কথা ইপসউইচ, কভেন্ট্রির মতো সদ্য প্রিমিয়ার লিগে উন্নীত ছোট দলগুলোও শত শত মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, ইংলিশ ফুটবলের এই মহা বন্যামুক্তির স্রোতে টিকে থাকতে হলে অর্থের শক্তির কোনো বিকল্প নেই।