ইতিহাস গড়েই জবাব দিলেন হৃদয়

পচেফস্ট্রুমে গতকাল চতুর্থ দিনের চা-বিরতির সময় তাওহীদ হৃদয়ের কাছে গিয়ে কিছু একটা বলতে দেখা গেল দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের একজন ক্রিকেটারকে। হয়তো নি®প্রাণ ড্রর দিকে যাওয়া ম্যাচটিকে এক সেশন আগেই মীমাংসার মাধ্যমে শেষ করতে চাচ্ছিলেন স্বাগতিকরা। তবে বাংলাদেশের এই ব্যাটারের শারীরিক অঙ্গভঙ্গিই বলে দিচ্ছিল প্রতিপক্ষ দলের প্রস্তাবে রাজি নন তিনি। ৩৩৩ রানে অপরাজিত থাকা হৃদয়ের ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ করতে তখন প্রয়োজন মাত্র ২ রান। এই ২ রান তাকে নিয়ে গেছে দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে একেবারে নতুন এক ঠিকানায়। যদিও পরে সেখানেও থামেননি তিনি। বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হিসেবে স্বীকৃত ক্রিকেটে ৩৫০ রান করে মাঠ ছাড়েন। ৪৮১ বলের অপরাজিত ইনিংসে একটা কড়া জবাবও হয়তো দিয়ে দিলেন এ তরুণ। অথচ এ ম্যাচে তার খেলারই কথা ছিল না। হৃদয় নিজেই নির্বাচকদের কাছে আবদার করেন। ঘরের মাঠে ভারত সিরিজটি না হলে দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘এ’ দলের হয়ে চার দিনের ম্যাচের সিরিজটি খেলবেন তিনি। তার এমন কথা কিছুটা বিস্মিত করে প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারকে, ‘হৃদয় নিজে থেকেই বলেছে যদি ভারত সিরিজ না হয়, তাহলে সে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে লাল বলের ক্রিকেট খেলতে চায়। সব ম্যাচ খেলতে চায়। সাধারণত যারা জাতীয় দলে ঢুকে পড়ে, তারা পরে ‘এ’ দলে খেলতে যেতে চায় না।’ যদিও প্রথম ম্যাচের দলে ছিলেন না হৃদয়।

সে ম্যাচে ভরাডুবি হয় বাংলাদেশের। প্রোটিয়াদের বিপক্ষে ইনিংস ও ৪১৩ রানে হারে। দ্বিতীয় ম্যাচেও বিপদে পড়েন সফরকারীরা। প্রথম ইনিংসে স্বাগতিকরা ৫১২ রান করে। এরপর ব্যাটিংয়ে নেমে ফলোঅনের শঙ্কায় পড়ে বাংলাদেশ দল। ৭৮ রানেই ৩ উইকেট হারায়। মাহমুদুল হাসান জয়, পারভেজ হোসেন ইমন ও নাঈম শেখ দ্রুত ফিরে গেলে দলের সামনে বিপদের শঙ্কা বাড়ে। সেখান থেকে লড়াই করে ইতিহাস গড়েন হৃদয়। যে মাঠে এর আগে স্বপ্নপূরণের গল্প লিখেছিলেন, সেই মাঠেই। দক্ষিণ আফ্রিকার এই পচেফস্ট্রুমের সেনউইস পার্কে ২০২০ সালে ভারতকে হারিয়ে প্রথমবার যুব বিশ্বকাপের শিরোপা জেতে বাংলাদেশ দল, যে দলের স্বপ্নসারথী ছিলেন হৃদয়ও।

গতকাল সেখানে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটি খেললেন তিনি। হৃদয় শুধু ট্রিপল সেঞ্চুরিই করেননি, দেশের ক্রিকেটের একটি দীর্ঘ অপেক্ষারও অবসান ঘটিয়েছেন। দেশের বাইরে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের ট্রিপল সেঞ্চুরি ছিল না এতদিন। সেই শূন্যস্থান পূরণ করলেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, একে একে পেছনে ফেলেছেন দেশের ক্রিকেটের বড় বড় নামকে। অথচ জিম্বাবুয়ে সফরের একমাত্র টেস্টে তাকে দলে রাখায় প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয় নির্বাচকদের। সাদা বলে নিয়মিত পারফর্ম করলেও ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে খুব বেশি খেলার অভিজ্ঞতা না থাকায় হৃদয় দেশের জার্সিতে টেস্টে কতটা সফল হবেন, সে নিয়ে আলোচনা হয়। অভিষেকের ওই টেস্টে সুবিধা করতে পারেননি এই তরুণ, ২ ইনিংসে ১২ রান করে পরের সিরিজেই বাদ পড়েন। হৃদয়ের ইতিহাস গড়া ইনিংস এখন নির্বাচকদের স্বস্তিতে ভাসাচ্ছে। কণ্ঠে তৃ প্তি নিয়ে বাশার বলেন, ‘আমাদের একটা বড় সমস্যা হচ্ছে, আমরা খুব দ্রুতই অপবাদ দিয়ে ফেলি। হৃদয়কে যখন আমরা টেস্ট দলে নিলাম, তখনই প্রশ্ন ওঠা শুরু হলো সাদা বলের একজন খেলোয়াড়কে লাল বলে কীভাবে নির্বাচিত করলাম। আমরা তো নির্বাচক। কোন খেলোয়াড়ের কী সামর্থ্য, সেটি তো আমরা জানি। একটু তো আমাদের ওপর ভরসা রাখতে হবে।’ আধুনিক টেস্ট ক্রিকেটের ব্যাটিংয়ের ধরনও বদলেছে। শুধু উইকেটে পড়ে থাকা নয়, প্রয়োজন হলে আক্রমণও করতে হয়।

হৃদয় সেই ক্রিকেটেরই প্রতিনিধি হতে পারেন বলে মনে করেন প্রধান নির্বাচক, ‘টেস্ট ক্রিকেট এখন আগের মতো নেই। এখন টেস্টে দুই ধরনের খেলোয়াড় রাখতে হয়। কিছু খেলোয়াড় থাকবে স্টেডি, কিছু খেলোয়াড় থাকবে আক্রমণাত্মক। হৃদয় এভাবে ব্যাটিং করেই সফল। যে এভাবে ব্যাটিং করে, তাকে লাল বলে খেলানো যাবে না, এমন তো কথা নেই।’ হৃদয়ের এই ইনিংসের মাহাত্ম্য বোঝাতে পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। বাংলাদেশের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৩০০ ছিল এতদিন মাত্র দুজনের। রকিবুল হাসান ও তামিম ইকবালের। ২০০৬-০৭ মৌসুমের জাতীয় ক্রিকেট লিগে বরিশালের হয়ে ফতুল্লায় রকিবুল করেছিলেন অপরাজিত ৩১৩ রান। এরপর ২০২০ সালে মিরপুরে বিসিএলের ম্যাচে তামিম ইকবাল ৩৩৪ রানে অপরাজিত ছিলেন। তামিমের সেই রেকর্ড এখন পেছনে পড়ে গেছে। ৩২৮ রানে দাঁড়িয়ে হৃদয় ডাগআউটের দিকে তাকিয়ে জানতে চান, আর কত লাগে। তারপর এলো সেই মুহূর্ত।

চা-বিরতির পর আবার খেলা শুরু হলো। কিছুক্ষণ পর ছক্কা মেরে তামিমের ছয় বছর আগের রেকর্ড ভেঙে দিলেন হৃদয়। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস এখন তার দখলে। পরে সেটাকে ৩৫০ পর্যন্ত টেনে নেন তিনি। এই ইনিংসের পর টেস্ট ক্রিকেটে হৃদয়ের মতো ব্যাটসম্যান কেন প্রয়োজন, সে ব্যাখ্যা দিলেন বাশার, ‘এত রান করতে গেলে তো স্ট্রোক খেলতে হয়। টেস্ট বা লাল বলের ক্রিকেটে যারা স্ট্রোক খেলতে পারে, তাদের সফলতার হার খুব ভালো হয়। তাই আমি খুশি যে ও রান করছে। অথচ জিম্বাবুয়ের একটা টেস্ট খারাপ করার পরই তো কথা ওঠে, আমরা তাকে শেষ করে দিলাম!’ শুধু বাংলাদেশের রেকর্ডই নয়, পচেফস্ট্রুমেও নতুন উচ্চতায় উঠেছেন হৃদয়। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বিদেশি ব্যাটারদের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস এখন তার। এতদিন এই রেকর্ড ছিল ইংল্যান্ডের সাবেক ব্যাটার ডেনিস কম্পটনের। ১৯৪৮-৪৯ মৌসুমে এমসিসির হয়ে ৩০০ রান করেছিলেন তিনি। হৃদয় সেই রেকর্ডও পেছনে ফেলেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে বিদেশি ব্যাটারদের মধ্যে সব মিলিয়ে অবশ্য হৃদয়ের সামনে আছেন আরেকজন। ২০০৯-১০ মৌসুমে প্রোটিয়াদের ঘরোয়া লিগে ৩৯০ রান করেছিলেন স্টিফেন কুক। তবে বিদেশি ব্যাটার হিসেবে সেই তালিকায় এখন হৃদয় ২ নম্বরে। যে সেনউইস পার্কে ২০২০ সালে বাংলাদেশের যুবাদের বিশ্বজয়ের গল্প লেখা হয়েছিল, সেই মাঠেই এবার লেখা হলো আরেকটি বাংলাদেশি ক্রিকেট গল্প। সেদিন হৃদয়ের হাতে ছিল বিশ্বকাপের ট্রফি, গতকাল উঁচিয়ে ধরলেন ব্যাট।