জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বিমুখী আঘাত ও মানবসৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়ে তীব্র অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দেশের একমাত্র সামুদ্রিক প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং একের পর এক শক্তিশালী নিম্নচাপের ফলে সাগরের উত্তাল ঢেউ এখন সরাসরি আঘাত হানছে দ্বীপের মূল ভূখ-ে। বর্ষা মৌসুম ও বৈরী আবহাওয়ায় জোয়ারের পানির উচ্চতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দ্বীপের চারপাশজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। সাগরের করাল গ্রাসে বিলীন হচ্ছে সৈকত, উপড়ে পড়ছে শত শত নারিকেল গাছ ও কেয়া বন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবিদদের আশঙ্কা জরুরিভিত্তিতে টেকসই ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে পর্যটকদের স্বপ্নের এই দ্বীপ। বর্তমানে সৈকতজুড়ে ভাঙন আতঙ্কে বিনিদ্র রাত কাটছে দ্বীপবাসীর।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দ্বীপের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ সৈকতের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বালিয়াড়ি ধসে পড়ছে। সাগরের একেকটি ঢেউয়ের তোড়ে তছনছ হয়ে যাচ্ছে উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী। জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট উঁচুতে উঠে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। ফলে সাগরের এত কাছাকাছি থাকা দ্বীপের প্রায় ১২ হাজার বাসিন্দা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
দ্বীপের ভুক্তভোগী বাসিন্দা মো. জুবাইর বলেন, ‘সমুদ্র থেকে আমাদের ঘরবাড়ির দূরত্ব মাত্র এক-দেড় মিনিটের পথ। রাত যত গভীর হচ্ছে, ঝড়-বৃষ্টি আর বাতাসের তীব্রতার সঙ্গে সমুদ্রের গর্জনও তত বাড়ছে। ঘর থেকে স্পষ্ট শোনা যায় সাগরের ডাক। প্রকৃতি এভাবে গ্রাস করতে থাকলে একদিন আমাদের প্রিয় সেন্টমার্টিন শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে।’
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, সেন্টমার্টিনের এই ভাঙনের জন্য প্রকৃতির চেয়ে মানুষের দায় কোনো অংশে কম নয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আইন অমান্য করে দ্বীপে আড়াই শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে তোলা হয়েছে। পর্যটন মৌসুমের সুযোগ নিয়ে এবং বর্ষায় প্রশাসনের নজরদারির অভাবকে কাজে লাগিয়ে রাতের আঁধারে কেয়া বন উজাড় করা হচ্ছে। কটেজ ও স্থাপনা নির্মাণের জন্য সৈকতের পাথর ও বালু উত্তোলনের ফলে দ্বীপের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বা ভূ-তাত্ত্বিক কাঠামো সম্পূর্ণ দুর্বল হয়ে পড়েছে। যে কেয়া বন এবং বালিয়াড়ি প্রাকৃতিকভাবে সাগরের ঢেউয়ের তীব্রতা শোষণ করত, তা ধ্বংস করার কারণেই আজ সাগর এতটা হিংস্র রূপ ধারণ করেছে।
এ বিষয়ে সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম দ্বীপবাসীর দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘ভাঙনের পাশাপাশি দ্বীপের বড় সংকট এখন সুপেয় পানির। জোয়ারের লোনা পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় নলকূপ ও ফসলি জমি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। দ্বীপের মানুষ ও এই ভূখ-কে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে পরিবেশবান্ধব ও স্থায়ী একটি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে দ্বীপবাসীকে অচিরেই বাস্তুচ্যুত হতে হবে।’
গবেষকদের মতে, সেন্টমার্টিন কোনো সাধারণ মাটির দ্বীপ নয়, এটি মূলত প্রবাল ও বালুর সমন্বয়ে গঠিত একটি সংবেদনশীল ইকোসিস্টেম। তাই শুধু কংক্রিটের গাইড ওয়াল বা বাঁধ দিয়ে একে টিকিয়ে রাখা যাবে না। দ্বীপের প্রবাল ও বালিয়াড়িকে বাঁচাতে হলে সবার আগে সব ধরনের বাণিজ্যিক ও স্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। প্রকৃতির ওপর মানুষের লাগামহীন অত্যাচার বন্ধ করা না গেলে, জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে সেন্টমার্টিনকে আর কোনোভাবেই বাঁচানো সম্ভব হবে না।
দ্বীপের পরিবেশগত সংকটাপন্ন অবস্থা নিয়ে কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, ‘অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ, যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত রিসোর্ট নির্মাণের ফলে দ্বীপের ধারণক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে। সেন্টমার্টিনের সুরক্ষায় দৈনিক পর্যটক সংখ্যা নির্দিষ্ট করা, দ্বীপে রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ করা এবং সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক সম্পূর্ণ বন্ধ করার মতো কঠোর নীতিমালা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে কেয়া বন পুনর্নির্মাণ ও উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী জোরদার করার ওপর আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।’
এ ব্যাপারে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনীক চৌধুরী বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জোয়ারের পানির উচ্চতা ও তরঙ্গের তীব্রতা বহুগুণ বেড়েছে। সেন্টমার্টিন যেহেতু একটি প্রবাল দ্বীপ, তাই এখানে সনাতন পদ্ধতির কোনো সাধারণ বাঁধ টিকবে না। কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের আদলে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক ব্লকের সমন্বয়ে বিশেষ স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে ভাবা দরকার। দ্বীপে নতুন করে যেকোনো ধরনের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন ও কোস্ট গার্ড কঠোর অবস্থানে রয়েছে।’