১৮ কর্মচারী দুই পরিবারের

শেরপুর পৌরসভায় নিয়ম বহির্ভূতভাবে দুই পরিবারের ১৮ কর্মচারী নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। পৌরসভার সহকারী কর আদায়কারী আব্দুল লতিফের পরিবারের ১২ জন এবং বাজার পরিদর্শক রফিকুজ্জামান ঝন্টুর পরিবারের ৬ সদস্য বিভিন্ন পদে চাকরি করছেন। স্থায়ী কর্মচারী ছাড়াও কেউ চুক্তিভিত্তিক ও কেউ অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছেন। অভিযোগ আছে, আওয়ামী লীগ আমলের তৎকালীন দুই মেয়রের আশীর্বাদপুষ্ট এই দুই কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে তাদের আত্মীয়স্বজনদের পৌরসভায় নিয়োগ দিয়েছেন।

জানা যায়, লতিফ ১৯৭৩ সালে প্রথম শেরপুর পৌরসভায় যোগদান করেন। অবসরে যান ২০১৪ সালে। ওই বছরই আবার তৎকালীন মেয়র গোলাম মোহাম্মদ কিবরিয়া তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেন এবং রফিকুজ্জামান ঝন্টু ১৯৯৫ সালে বাজার পরিদর্শক হিসেবে যোগদান করেন।

পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, লতিফের আত্মীয়স্বজনরা হলেন তার বড় ছেলে পাম্পচালক আমিনুল ইসলাম (যোগদান ১৯৯৭ সাল), ছোট ছেলে সুপারভাইজার রাশেদুল ইসলাম (যোগদান ২০১২ সালে), পুত্রবধূ উদ্যোক্তা শরীফা বেগম (২০১৫ সালে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ), আমিনুলের শ্যালক মালী মো. মোবারক হোসেন (যোগদান ২০০৭ সালে), কিন্তু তিনি মালীর পরিবর্তে পিয়নের কাজ করেন, তার পরিবর্তে অন্য একজনকে মাস্টাররোলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে; লতিফের ভাগ্নে বিদ্যুৎ হেলপার আব্দুল কাদের কাদু (যোগদান ২০১৫ সালে), লতিফের ভায়রা সার্ভেয়ার আবুল বাশার (মেশিন অপারেটর পদে ১৯৯৭ সালে যোগদান), বাশারের ছেলে নাইমুল ইসলাম বাবু (২০২৬ সালে মাস্টাররোলে যোগদান), বাশারের ছোট ভাই এমএলএস তানভীর আহাম্মেদ (যোগদান ২০১৩ সালে), বাশারের জামাতা স্বাস্থ্য সহকারী মো. শফিকুল ইসলাম (যোগদান ২০১৪ সালে), লতিফ ও বাশারের ভাগ্নে পিয়ন রুবেল মিয়া (যোগদান ২০১৩ সালে), লতিফের আরেক ভায়রা সহকারী কর আদায়কারী আইয়ুব আলী (যোগদান ১৯৯৫ সালে)।

অন্যদিকে রফিকুজ্জামান ঝন্টুর আত্মীয়স্বজনরা হলেন তার মামাতো ভাই তিন সহোদার পিয়ন মো. সোহেল রানা (যোগদান ২০১০ সালে), নৈশপ্রহরী আবুল হোসেন (যোগদান ২০১৪ সালে) ও পাম্পচালক জুহুরুল ইসলাম রুবেল (যোগদান ২০১৪ সালে; ঝন্টুর ভাগ্নি জামাই পাইপ লাইন মেকানিক মো. আরফান আলী (যোগদান ২০১৪ সালে), ঝন্টুর ভাতিজা কার্য সহকারী সাজিবর রহমান সাজু (যোগদান ২০১৩ সালে)।

জানা যায়, রফিকুজ্জামান ঝন্টু একাধারে ১৫ বছর পৌর কর্মচারী সংসদের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তখন তার হাত ধরে অন্তত ১৫ জন কর্মচারী আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিভিন্ন পদে নিয়োগ পান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পৌরসভার দুই কর্মচারী বলেন, ২০১১ সালে হুমায়ুন কবীর রুমান পৌরমেয়র হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন ঝন্টু ও রুমান মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। এরপর থেকেই বেপরোয়া হয়ে উঠেন ঝন্টু। বাজার পরিদর্শক হওয়ায় পৌরসভার প্রত্যেক বাজারের ইজারার সঙ্গে তিনি শেয়ার থাকতেন। ঝন্টুকে শেয়ার না দিলে কেউ ইজারা পেত না। পুরো পৌরসভায়ই নিয়ন্ত্রণ করেন দুই পরিবারের সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি সিন্ডিকেট।

পৌরসভার একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ দুই পরিবারের ১৮ কর্মচারীর অধিকাংশ নিয়োগের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি বা পৌরসভা নিয়োগ বিধিমালা অনুসরণ করা হয়নি। পৌরসভার কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক দুই মেয়র গোলাম মোহাম্মদ কিবরিয়া লিটন ও হুমায়ুন কবীর রুমানের আমলে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

দুই পরিবারের ১৮ সদস্য মাসে প্রায় চার লাখ টাকা বেতন উত্তোলন করছেন। এ ছাড়াও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত চুক্তিভিত্তিক কিংবা মাস্টাররোলে বিভিন্ন কর্মকর্তার লোকজন নিয়োগ দিচ্ছে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে পৌরসভার নাগরিকরা সময়মতো পৌরকর পরিশোধ করেও মিলছে না কাক্সিক্ষত নাগরিক সেবা।

পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত ৭৭ জন এবং চুক্তিভিত্তিক ও মাস্টাররোলে ২৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন প্রথম শ্রেণির এই পৌরসভায়। পৌরসভার অস্টমিতলা মহল্লার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন গামা বলেন, একটি ড্রেনের অভাবে কয়েক একর জায়গা আমরা আবাদ করতে পারছি না। দীর্ঘ ১০ বছর থেকে ছোট একটি ড্রেন নির্মাণের আবেদন দিয়ে আসছি পৌরসভায়, করে দিচ্ছে না।

আব্দুল লতিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারা সবাই আমার আত্মীয় হলেও আমাকে ব্যবহার করে কিন্তু তারা চাকরিতে আসেনি, যার যার ক্ষমতা বলেই চাকরি করছে। রফিকুজ্জামান ঝন্টু দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাবেক মেয়র রুমান ও আমার বাড়ি পাশাপাশি হওয়ায় তার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। কর্মচারী নিয়োগের বিষয়ে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো সময়ই বাজারের ইজারার সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না।

স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ও শেরপুর পৌরসভার প্রশাসক আরিফা সিদ্দিকা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই প্রথম শুনলাম দুই পরিবারের এতগুলো কর্মচারী এই পৌরসভায় চাকরি করছেন। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।