মাদকের কারবার নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ, স্থানীয়দের ক্ষোভ আর সামাজিক প্রতিরোধ—শেষ পর্যন্ত সবকিছুর মুখে জামতলার বাসা ছাড়তে হল গাঁজা বিক্রির অভিযোগে অভিযুক্ত আলোচিত মানিককে।
নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির উদ্যোগ ও সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিকের ওপর সামাজিক চাপের পর বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) তিনি ওই বাসা ছেড়ে চলে গেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, জামতলায় মানিকের নাম মাদক কারবারের সঙ্গে বহুদিন ধরেই উচ্চারিত হয়ে আসছে। তার বাসাকে ঘিরে গাঁজা বিক্রি ও মাদকসেবীদের আনাগোনা চলত।
স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার আপত্তি উঠলেও তাতে খুব একটা কর্ণপাত করা হয়নি। যেন আবাসিক এলাকা নয়, মাদক কারবারের জন্যই জায়গাটি তার ‘নিরাপদ ঠিকানা’।
আর এই পরিস্থিতিতেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—একটি আবাসিক এলাকায় দিনের পর দিন মাদকের অভিযোগ থাকা একজন ব্যক্তি কীভাবে নির্বিঘ্নে বসবাসের সুযোগ পান?
স্থানীয়দের অভিযোগ, মানিকের বিরুদ্ধে অতীতেও মাদকবিরোধী একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারের ঘটনা রয়েছে। তিনি কারাগারেও ছিলেন। কিন্তু জেল খেটে বের হওয়ার পরও মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ থেকে তার নাম মুছে যায়নি। বরং স্থানীয়দের দাবি, জামতলায় ফিরে এসে তিনি আবারও একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, মাদকের এই কারবারে শুধু মানিক একা নন। পরিবারের কয়েকজনকেও তিনি এই ‘লাইনে’ নিয়ে এসেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তার ছোট ছেলে রাসেল এবং এক নাতিও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বিষয়টি এলাকার মানুষের কাছে নতুন কোনো তথ্য নয় বলেও তারা দাবি করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি বাসাকে ঘিরে মাদকসেবীদের আনাগোনা চলতে থাকলে তার প্রভাব শুধু ওই পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আশপাশের কিশোর-তরুণদের জন্য তৈরি হয় বিপজ্জনক পরিবেশ। সন্ধ্যার পর অপরিচিত তরুণদের চলাচল নিয়েও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল বলে জানান তারা।
একজন বাসিন্দার ভাষায়, বাসা ভাড়া নেওয়া ব্যক্তির ব্যক্তিগত অধিকার আছে। কিন্তু সেই বাসা যদি মাদক বিক্রির আখড়ায় পরিণত হয়, তখন সেটি আর ব্যক্তিগত বিষয় থাকে না। তখন পুরো মহল্লার নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আর সেই জায়গাতেই এবার সরাসরি অবস্থান নেয় নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সোসাইটির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট বাড়ির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাকে মানিকের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ, বাসাটিকে ঘিরে মানুষের উদ্বেগ এবং আবাসিক পরিবেশের ওপর এর প্রভাবের বিষয়টি জানানো হয়। একই সঙ্গে মানিককে আর ওই বাসায় না রাখার জন্য সামাজিকভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়।
শেষ পর্যন্ত বাড়ির মালিকও অবস্থান পরিবর্তন করেন। মানিককে বাসা ছাড়তে বলা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার তিনি ওই বাসা ছেড়ে চলে যান।
অর্থাৎ, এতদিন যে ঠিকানাকে ঘিরে স্থানীয়দের অভিযোগ ও ক্ষোভ জমছিল, সামাজিক প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত সেই ঠিকানাই তাকে ছেড়ে যেতে হল।
স্থানীয়দের কেউ কেউ ঘটনাটিকে মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধের ‘প্রথম বিজয়’ হিসেবে দেখছেন। তাদের বক্তব্য, পুলিশের অভিযান প্রয়োজন, মামলা প্রয়োজন, আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন—কিন্তু একই সঙ্গে সমাজ যদি মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে মুখ বন্ধ করে থাকে, তাহলে শুধু পুলিশের পক্ষে পুরো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আমরা কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হেনস্তা করতে চাই না। কিন্তু মাদক বিক্রি করে কেউ একটি আবাসিক এলাকায় বসে থাকবে, আর সবাই চোখ বন্ধ করে থাকবে—এটা হতে পারে না।
বাসিন্দাটি আরও বলেন, বাড়ির মালিকদেরও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কোনো ভাড়াটিয়ার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। কারণ একটি বাসা শুধু একজন ভাড়াটিয়াকে আশ্রয় দেয় না; সেই বাসার পরিবেশ আশপাশের পুরো এলাকার ওপর প্রভাব ফেলে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মানিক বর্তমানে কোথায় আছেন তা তারা জানেন না। তবে তাদের ভয়, তিনি অন্য কোথাও গিয়ে আবার একই কারবার শুরু করতে পারেন। তাই শুধু জামতলা থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়; তার বিরুদ্ধে থাকা মাদকসংক্রান্ত অভিযোগগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহরাব আল হোসাইন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে খিলক্ষেত থানা পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। মাদকসংক্রান্ত যেকোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ওসি সোহরাব আল হোসাইন আরও বলেন, মাদকের আগ্রাসন থেকে যুব ও তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে পুলিশ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ ক্ষেত্রে পরিবারের পাশাপাশি সমাজের সচেতন মানুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
এদিকে স্থানীয়দের প্রশ্ন অবশ্য আরও বড়—একজন মানিক চলে গেলেই কি মাদকের কারবার শেষ?
উত্তরও তাদের জানা নেই।
কারণ মাদক ব্যবসা কোনো এক ব্যক্তির নাম নয়; এটি একটি চক্র। একজনকে সরিয়ে দিলে অন্য কেউ জায়গা দখল করতে পারে। তাই জামতলার বাসিন্দারা চান, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেন প্রশাসনের নজরদারি আরও বাড়ে। মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে যেসব বাড়ি মাদক কারবারের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়।
সোসাইটির স্থানীয় উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত একজন বলেন, আমরা চাই না জামতলার কোনো বাসা মাদক বিক্রির নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হোক। বাড়ির মালিকদেরও বুঝতে হবে—ভাড়া দেওয়ার আগে ভাড়াটিয়া সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি এলাকার নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।
এলাকাবাসীর ভাষায়, জামতলায় মাদক বিক্রি করে দিব্যি বসবাসের দিন শেষ।
মানিকের বাসা ছাড়ার ঘটনাটি অন্তত সেই বার্তাটিই দিয়েছে। তবে এই বার্তা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে এরপর কী হয় তার ওপর। একজনকে সরিয়ে দিয়ে যদি অন্য কাউকে জায়গা দেওয়া হয়, তাহলে পুরো উদ্যোগই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
তাই স্থানীয়দের দাবি, সামাজিক প্রতিরোধের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।